পরিবারের মুখে একটুখানি হাসি ফোটানো আর জীবনের সচ্ছলতা ফেরাতে বুকভরা আশা নিয়ে সুদূর প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন তাঁরা। দিন-রাত এক করে করেছেন হাড়ভাঙা পরিশ্রম। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘোরার আগেই, কাতারের এক মরুময় সড়কে ঝরে গেল পাঁচটি তাজা প্রাণ। স্বপ্নগুলো পূরণ হওয়ার আগেই তাঁরা দেশে ফিরলেন, তবে জীবন্ত মানুষ হয়ে নয়— কফিনবন্দি লাশ হয়ে। একই এলাকার পাঁচ সন্তানের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শুধু কানাইঘাট উপজেলা নয়, পুরো সিলেটজুড়ে নেমে এসেছে বুকফাটা শোকের ছায়া।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে (বিজি-২২৬) যখন পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়, তখন চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে স্বজনদের আকুল আহাজারিতে। বিমানবন্দরে উপস্থিত কাউকেই চোখের পানি ধরে রাখতে দেখা যায়নি।
বিমানবন্দরের কার্গো শেডের সামনে তখন কান্নার রোল। কিন্তু সব কান্না ছাপিয়ে সবার বুক ভেঙে যাচ্ছিল একটি দৃশ্য দেখে। নিহত জিবাল আহমদের কফিনের পাশে মুখভার করে পাথরের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর দুই অবুঝ শিশু— পারভেজ ও নিশা। তারা হয়তো পুরোপুরি বুঝতেই পারছিল না যে, এই কাঠের বাক্সের ভেতরেই চিরতরে ঘুমিয়ে আছেন তাদের আদর ছড়ানো বাবা, যিনি আর কোনোদিন তাদের কোলে তুলে নেবেন না। এ্যাম্বুল্যান্সে লাশ তোলার আগ পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও বাবার কফিন ছেড়ে নড়েনি এই দুই শিশু। তাদের এই বোবা চাহনি দেখে উপস্থিত দূর সম্পর্কের আত্মীয় ও সাধারণ মানুষেরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নিহতদের পরিবারের হাতে আর্থিক অনুদানের চেক তুলে দেন সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান। এরপর পাঁচটি অ্যাম্বুল্যান্স যখন সাইরেন বাজিয়ে কানাইঘাটের দিকে ছুটে চলে, তখন গ্রামীণ জনপদে তৈরি হয় এক অবর্ণনীয় স্তব্ধতা।
মরদেহগুলো নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছামাত্রই যেন কান্নার বাঁধ ভেঙে যায়। সন্তানহারা মা-বাবা, স্বামীহারা স্ত্রী আর ভাইদের শেষবার দেখতে গিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন স্বজনরা। প্রিয় মুখগুলোকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে হাজারো মানুষ ভিড় জমান বাড়িগুলোতে। এলাকার প্রতিটি ঘরে তখন চলছে শোকের মাতম।
পরে বাদ জোহর কানাইঘাটের গাছবাড়ি জামিউল উলুম কামিল মাদরাসা মাঠে তাঁদের যৌথ জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ পরম মমতায় শরিক হন এই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের শেষ বিদায়ের প্রার্থনায়। জানাজা শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
যে দুর্ঘটনায় নিভে গেল পাঁচ প্রদীপের আলো
নিহত এই পাঁচ রেমিট্যান্সযোদ্ধা হলেন—
- কাদির আহমদ (৩৩), বাবা: বাহার উদ্দিন (নিজ গাছবাড়ি গ্রাম)
- জিবাল আহমদ (৩৫), বাবা: মৃত আব্দুন নূর (আমরপুর গ্রাম)
- জসিম উদ্দিন (৩৮), বাবা: সিরাজ উদ্দিন (মাঝতালুক গ্রাম)
- মস্তাক আহমদ (২৭), বাবা: সেলিম আহমদ (আগতালুক গ্রাম)
- জুবের আহমদ (২৮), বাবা: মড়া মিয়া (আগতালুক গ্রাম)
এর আগে গত ২১ জুন কাতারের শাহানিয়া এলাকার একটি মহাসড়কে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। কাতার সময় সকাল ১০টার দিকে প্রতিদিনের মতো তাঁরা একটি গাড়িতে করে নিজেদের কর্মস্থলের দিকে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথেই তাঁদের বহনকারী গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়ক থেকে ছিটকে গিয়ে দুমড়েমুঝড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই চালকসহ প্রাণ হারান এই ৫ বাংলাদেশি। বাংলাদেশ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে এবং কাতারস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের সার্বিক প্রচেষ্টায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে আজ তাঁদের মরদেহ দেশে আনা হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















