সপ্তাহজুড়ে অফিস, যানজট, কাজের চাপ আর ব্যস্ততার পর একদিনের ছুটি পেলেই যে ঢাকার বাইরে ছুটতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। রাজধানীর অভ্যন্তরেই রয়ে গেছে এমন কিছু প্রাচীন স্থান, যেখানে কয়েক ঘণ্টা কাটালেই মনে হবে নগরের কোলাহল পেছনে ফেলে আপনি চলে গেছেন কয়েক শতাব্দী আগের কোনো ঐতিহাসিক পর্বে।
পুরান ঢাকার লালবাগে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা ‘লালবাগ কেল্লা’ তেমনই এক অপূর্ব নিদর্শনের প্রতীক। মুঘল আমলের অসমাপ্ত এই দুর্গে রয়েছে স্থাপত্য, অনন্য ইতিহাস, সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আবহ—সবকিছুর এক মনমুগ্ধকর মেলবন্ধন। ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, একসময় দুর্গের দক্ষিণ পাশের সঙ্গেই বুড়িগঙ্গার সরাসরি প্রবাহ ছিল; পরবর্তীতে নদীর গতিপথ বদলে যাওয়ায় কেল্লাটি নদী থেকে খানিকটা দূরে সরে পড়ে।
চারশত বছরের পুরোনো এক অসমাপ্ত গল্প লালবাগ কেল্লার প্রাথমিক নাম ছিল ‘কেল্লা আওরঙ্গাবাদ’। ১৬৭৮ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সুযোগ্য পুত্র আজম শাহ বাংলার সুবাদার থাকাকালে এই দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন। তবে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকায় তাঁর অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৬৭৯ সালে তিনি দিল্লি ফিরে গেলে কেল্লার নির্মাণ এবং পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত হয় পরবর্তী সুবাদার শায়েস্তা খাঁ-র ওপর।
শায়েস্তা খাঁ কেল্লার নির্মাণকাজ বেশ কিছুটা এগিয়ে নিলেও এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। ১৬৮৪ সালে তাঁর প্রিয় কন্যা ইরান দুখত (যিনি ‘বিবি পরী’ নামে সমাধিক পরিচিত)-এর আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। কন্যার এই অকালপ্রয়াণকে শায়েস্তা খাঁ অশুভ ইঙ্গিত বলে মনে করেন এবং কেল্লার কাজ স্থগিত করে দেন। সেই থেকে এই অসমাপ্ত নির্মাণই হয়ে ওঠে বাংলার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থাপনা। লালবাগ কেল্লার মূল সৌন্দর্য শুধু এর বাহ্যিক স্থাপত্যে নয়, বরং এর প্রতিটি ইটের খাঁজে লুকিয়ে আছে মুঘল রাজপরিবারের সাফল্য, বেদনা ও প্রশাসনিক ইতিহাসের ছোঁয়া।
কেল্লায় ঢুকলেই চোখে পড়বে বর্তমানে কেল্লার বিস্তৃত চত্বরে পা রাখলেই নজর কাড়বে সুবিন্যস্ত সবুজ প্রাঙ্গণ, সুবিশাল জলাধার, প্রাচীন প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ এবং মুঘল স্থাপত্যের সুনিপুণ বিন্যাস। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণায় কেল্লা এলাকায় বহু লুকায়িত কাঠামোর সন্ধান মিলেছে। ফলে আগে কেবল তিনটি প্রধান স্থাপনার ধারণা প্রচলিত থাকলেও, এর ঐতিহাসিক পরিসর যে আরও বিশাল তা এখন প্রমাণিত।
পরীবিবির সমাধি: লালবাগ কেল্লার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত রাজকীয় মার্বেল পাথর, সুদৃশ্য কষ্টিপাথর ও অলংকৃত টাইলসে তৈরি বিবি পরীর সমাধিসৌধ। এর কেন্দ্রীয় মূল কক্ষটিকে ঘিরে রয়েছে একাধিক কক্ষ, যা মুঘল সমাধি-স্থাপত্যের চমৎকার নিদর্শন।
দেওয়ান-ই-আম ও হাম্মামখানা: দরবার পরিচালনার জন্য তৈরি দোতলা ‘দেওয়ান-ই-আম’-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সুপরিকল্পিত ‘হাম্মামখানা’ বা প্রসাধনাগার। বর্তমানে এই অংশটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে মুঘল আমলের রাজকীয় তলোয়ার, মুদ্রা, পাণ্ডুলিপি ও চিত্রকলা প্রদর্শিত হয়।
তিন গম্বুজের মসজিদ: কেল্লার পশ্চিম অংশে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। সামনের বিশাল জলাধারের শান্ত জলের প্রতিফলনে মসজিদটি এক অপার্থিব সৌন্দর্য ধারণ করে।
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে বাংলাপিডিয়া সূত্রে জানা গেছে, কেল্লা এলাকায় অন্তত ২৬ থেকে ২৭টি পৃথক কাঠামোর অস্তিত্ব রয়েছে—যার মধ্যে কেল্লার সুরক্ষিত সুড়ঙ্গ পথ, পয়েন্টযুক্ত ড্রেনেজ সিস্টেম, সেন্ট্রি বক্স ও সুবিশাল নিরাপত্তা প্রাচীর অন্যতম। এ কারণেই এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের পাশাপাশি ইতিহাসবিদ ও স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সমৃদ্ধ গবেষণার ক্ষেত্র।
কখন এবং কীভাবে যাবেন?
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী লালবাগ কেল্লা প্রতি রোববার সাপ্তাহিক পূর্ণ দিবস বন্ধ থাকে এবং সোমবার অর্ধদিবস খোলা থাকে। মঙ্গলবার থেকে শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে সরকারি ছুটির দিনে সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। সাধারণ বাংলাদেশি দর্শনার্থীদের জন্য টিকিট ২০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ১০০ টাকা এবং অন্যান্য বিদেশি পর্যটকদের জন্য ২০০ টাকা। (৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনো ফি লাগে না)।
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে এসে রিকশায় খুব সহজেই কেল্লায় পৌঁছানো যায়। এছাড়া পুরান ঢাকার পুরানো রুট—সদরঘাট থেকে বাবুবাজার ব্রিজের নিচ দিয়েও লালবাগে আসা সম্ভব। পুরান ঢাকার যাতায়াত এড়াতে সকালের দিকে রওনা হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
একদিনে পুরান ঢাকার আরও কিছু ঐতিহাসিক স্থান লালবাগ কেল্লা পরিদর্শনের পর হাতে অতিরিক্ত সময় থাকলে কাছাকাছি অবস্থিত আহসান মঞ্জিল, অনন্য অলংকরণের তারা মসজিদ, শিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক স্থান হোসেনি দালান, ঐতিহাসিক আর্মেনিয়ান চার্চ এবং দিনশেষে বুড়িগঙ্গার প্রাণচাঞ্চল্য দেখতে সদরঘাট ঘুরে আসতে পারেন।
ভ্রমণ টিপস ও দায়িত্বশীল আচরণ দুর্গের প্রাচীন স্থাপনা ও চিত্রকর্ম আমাদের জাতীয় সম্পদ। তাই জাদুঘরের নিদর্শনে স্পর্শ করা বা প্রাচীন দেয়ালে আঁচড় কাটা থেকে বিরত থাকা উচিত। প্রাঙ্গণে প্লাস্টিক বা আবর্জনা না ফেলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা প্রত্যেক দর্শনার্থীর দায়িত্ব। কেল্লার পূর্ণ সৌন্দর্য উপভোগের জন্য অন্তত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দেখা ভালো।
ছুটির দিনে নিজের শহরের বুকে ঘুমিয়ে থাকা চারশত বছরের পুরোনো ইতিহাসকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা থেকে।
আইনবার্তা২৪ ডেস্ক 













