বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদ ও ওয়াকআউটের মধ্যেই জাতীয় সংসদে বহুল আলোচিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’ কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। বিল দুটির বিভিন্ন বিধান নিয়ে সংসদের ভেতরের বিরোধী দলসহ বাইরের একাধিক মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজ উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল।
বিল উত্থাপন থেকে শুরু করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আলোচনা—সব পর্যায় নিয়েই আপত্তি ছিল বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিল পাসের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন তারা। এর আগে উত্থাপনের দিন জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ জানান।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা কোনো দুর্বল আইনের অংশীদার হতে চাই না।” তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সরাসরি তদন্তের সুযোগ থাকলেও শৃঙ্খলা বাহিনীর বেলায় ভিন্ন ও সীমিত ক্ষমতা রাখা হয়েছে—যা আইনের দ্বৈত নীতি।
মানবাধিকার কমিশন বিলে প্রধান যেসব পরিবর্তন: ২০০৯ সালের আইন রহিত করে নতুন এই আইনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনারের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। এর মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য থাকা বাধ্যতামূলক। স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি ও বিরোধী দলের প্রতিনিধি, ইউজিসি অধ্যাপক, নাগরিক সমাজ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধির সমন্বয়ে শক্তিশালী বাছাই কমিটি গঠিত হবে। শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে কমিশন সরাসরি ব্যবস্থা না নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে প্রতিবেদন চাইবে। জবাবে সন্তুষ্ট না হলে সুপারিশ করা হবে, যার ওপর সংস্থাটি ৪৫ দিনের মধ্যে জবাব দেবে।
গুমের কঠোর শাস্তি ও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা
নতুন বিলে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিনঅযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো সরকারি বা শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের পর তা অস্বীকার বা গোপন রাখলে তা গুম বলে গণ্য হবে। গুমের সর্বনিম্ন শাস্তি ৩ বছর এবং সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে, লাশ মিললে বা ৫ বছর নিখোঁজ থাকলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড।
গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও পরিবারের ভরণপোষণে ভুক্তভোগীর সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। ৫ বছর পর গুম সনদের মাধ্যমে উত্তরাধিকারীদের মাঝে সম্পত্তি বণ্টন করা যাবে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি বা সরকারি তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে। তদন্ত ও তথ্য সংরক্ষণে থাকবে কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ।
তদন্ত ও বিচারের সময়সীমা সর্বোচ্চ ১২০ দিন। দায়রা জজ আদালতে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে (বিশেষ প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন বাড়ানো যাবে)। ক্ষেত্রবিশেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলা হস্তান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে। মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা প্রমাণ হলে অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
অধ্যাদেশ থেকে আইনি রূপ এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ইস্যু করা অধ্যাদেশ দুটি সংসদে অনুমোদিত না হওয়ায় ল্যাপস হয়ে যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সংসদে জানান, আগের অধ্যাদেশে বেশ কিছু আইনি ত্রুটি ছিল। অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে সেগুলোকে আরও শক্তিশালী করে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন বিলে পরিণত করা হয়েছে।
আইনবার্তা২৪ ডেস্ক 













