ভাড়াটিয়া নিয়মিত ভাড়া দিচ্ছেন না, অথচ বাড়ি ছেড়ে দিতেও রাজি নন—এমন পরিস্থিতিতে অনেক বাড়িওয়ালাই সমস্যায় পড়েন। কেউ কেউ রাগের বশে বিদ্যুৎ-পানি বন্ধ করে দেন, আবার কেউ তালা লাগিয়ে ভাড়াটিয়াকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
বাংলাদেশের বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আইনে বাড়িওয়ালার জন্য আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই জোর করে উচ্ছেদের পরিবর্তে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় এগোনোই নিরাপদ।
লিখিত নোটিশ ও চুক্তির শর্ত আগে দেখুন
প্রথমেই বাড়িওয়ালার উচিত ভাড়ার চুক্তিপত্র থাকলে সেটি ভালোভাবে পর্যালোচনা করা। চুক্তিতে ভাড়া দেওয়ার তারিখ, চুক্তির মেয়াদ, বাড়ি ছাড়ার শর্ত এবং নোটিশের বিষয়ে কী বলা আছে—তা গুরুত্বপূর্ণ।
Transfer of Property Act, 1882-এর ধারা ১০৬ অনুযায়ী, চুক্তি বা প্রযোজ্য স্থানীয় আইন/রীতিতে ভিন্ন কিছু না থাকলে আবাসিকসহ অন্যান্য উদ্দেশ্যে মাসিক ভিত্তিতে দেওয়া ইজারা সাধারণত ১৫ দিনের লিখিত নোটিশে শেষ করা যায়। নোটিশটি লিখিত হতে হবে এবং আইনসম্মতভাবে দিতে হবে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ভাড়ার চুক্তিতে আলাদা শর্ত থাকলে সেই শর্ত এবং প্রযোজ্য বিশেষ আইনও বিবেচনা করতে হবে। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের নোটিশ দিলেই সব ক্ষেত্রে উচ্ছেদ করা যাবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
জমির দলিল আসল না নকল? জাল দলিল চেনার ৮ উপায়
বকেয়া ভাড়ার হিসাব ও প্রমাণ রাখুন
ভাড়াটিয়া ভাড়া না দিলে বাড়িওয়ালার উচিত বকেয়া ভাড়ার পূর্ণ হিসাব তৈরি করা। পাশাপাশি সংরক্ষণ করতে হবে—
- ভাড়ার চুক্তিপত্র;
- ভাড়া পরিশোধের রসিদ;
- ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেনের তথ্য;
- বকেয়া ভাড়ার হিসাব;
- ভাড়াটিয়াকে পাঠানো নোটিশের কপি;
- নোটিশ পাঠানোর ডাক বা কুরিয়ার রসিদ;
- প্রয়োজনে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে ভাড়া সংক্রান্ত লিখিত যোগাযোগ।
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপে এসব নথি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কখন ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদের প্রশ্ন আসে?
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর ধারা ১৮ অনুযায়ী, আইনসম্মত ভাড়া পরিশোধ এবং ভাড়ার শর্ত পূরণ করা হলে সাধারণভাবে ভাড়াটিয়ার দখল পুনরুদ্ধারের আদেশ বা ডিক্রি দেওয়া যায় না। তবে আইনে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে, যেমন—
- নির্ধারিত সময়ে বাসা ভাড়া পরিশোধ না করা;
- মালিকের লিখিত সম্মতি ছাড়া বাড়ি বা এর অংশ অন্যের কাছে সাবলেট করা;
- বাড়িতে আইনবিরোধী কার্যকলাপ করা;
- বাড়ি দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করা;
- বাড়ি পুনর্নির্মাণের জন্য মালিকের প্রয়োজন হওয়া;
- আইন অনুযায়ী মালিকের নিজস্ব বা নির্দিষ্ট প্রয়োজনের কারণে বাড়িটি প্রয়োজন হওয়া;
- অথবা আইনে স্বীকৃত অন্য কোনো কারণ থাকা।
বিশেষ করে ভাড়া বকেয়ার ক্ষেত্রে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর ধারা ১৮(৫)-এ ভাড়া পরিশোধের সময়সীমা সম্পর্কে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। চুক্তিতে ভাড়া দেওয়ার তারিখ নির্ধারিত থাকলে সেই সময়ের পর ১৫ দিনের বিধান এবং চুক্তিতে এমন সময় নির্ধারিত না থাকলে সংশ্লিষ্ট ভাড়া বকেয়া হওয়ার পরবর্তী দুই মাসের বিধান প্রাসঙ্গিক।
জিডি ও এজাহারের আসল পার্থক্য কোথায়?
ভাড়াটিয়া না সরলে কী করবেন?
নোটিশ দেওয়ার পরও ভাড়াটিয়া বাড়ি ছেড়ে না দিলে বা আইনসম্মতভাবে বকেয়া ভাড়া পরিশোধ না করলে পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযুক্ত আদালত বা সংশ্লিষ্ট আইনগত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দখল পুনরুদ্ধার ও বকেয়া ভাড়া আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।
কোন আদালতে বা কোন প্রক্রিয়ায় যেতে হবে, তা নির্ভর করে ভাড়ার চুক্তি, সম্পত্তির ধরন, ভাড়াটিয়ার অবস্থান এবং মামলার কারণের ওপর। তাই মামলা করার আগে আইনজীবীর মাধ্যমে নথিপত্র যাচাই করা ভালো।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন মামলাতেও ভাড়াটিয়া উচ্ছেদের ক্ষেত্রে নোটিশ, বকেয়া ভাড়া এবং বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর বিধান বিবেচনার বিষয় হিসেবে এসেছে।
ভাড়াটিয়া ভাড়া দিতে অস্বীকার করলে কী করবেন?
অনেক সময় বাড়িওয়ালা ভাড়া নিতে অস্বীকার করেন—আবার কখনো ভাড়াটিয়া দাবি করেন যে তিনি ভাড়া দিতে চেয়েছেন, কিন্তু মালিক তা গ্রহণ করেননি। এমন পরিস্থিতিতে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর ধারা ১৯ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভাড়াটিয়া নিয়ন্ত্রকের কাছে ভাড়া জমা দেওয়ার সুযোগ পান।
তাই বাড়িওয়ালার পক্ষ থেকে ভাড়া গ্রহণ না করার বিষয়টিও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা উচিত।
যা করা উচিত নয়
ভাড়াটিয়া ভাড়া না দিলেও বাড়িওয়ালার নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া ঠিক নয়।
বিশেষ করে—
- জোর করে ঘরে ঢুকে পড়া;
- ভাড়াটিয়ার মালামাল বাইরে ফেলে দেওয়া;
- নিজে তালা লাগিয়ে দেওয়া;
- বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে চাপ সৃষ্টি করা;
- ভাড়াটিয়াকে শারীরিকভাবে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করা
—এ ধরনের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে এবং আলাদা আইনি বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে।
শ্রম আইন ও চাকুরিজীবীদের অধিকার: গ্র্যাচুইটি, ওভারটাইম ও অবসানজনিত পাওনা
নোটিশ ও কাগজপত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভাড়াটিয়ার সঙ্গে বিরোধ তৈরি হলে মৌখিক কথাবার্তার চেয়ে লিখিত নথি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাড়িওয়ালার উচিত শুরু থেকেই—
চুক্তিপত্র → ভাড়া পরিশোধের রেকর্ড → বকেয়ার হিসাব → লিখিত নোটিশ → নোটিশ দেওয়ার প্রমাণ—এসব সংরক্ষণ করা।
এতে ভবিষ্যতে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ালে নিজের বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা সহজ হয়।
ভাড়াটিয়া ভাড়া না দিলে বা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে বাড়িওয়ালার আইনি প্রতিকার রয়েছে। তবে নিজে জোর করে উচ্ছেদ করার পরিবর্তে চুক্তির শর্ত, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আইনের বিধান অনুসরণ করে ধাপে ধাপে এগোনো উচিত।
প্রতিটি ভাড়ার বিরোধের ঘটনা ও কাগজপত্র এক রকম নয়। তাই নোটিশ বা মামলা করার আগে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র একজন আইনজীবীকে দেখিয়ে নেওয়া নিরাপদ।
অ্যাড. শৌনক কিংশুক 













