থানায় গিয়ে কোনো ঘটনা জানাতে হলে অনেকেই বুঝতে পারেন না—জিডি করবেন, নাকি এজাহার (এফআইআর) করবেন? সাধারণ মানুষের মধ্যে জিডি ও মামলাকে একই বিষয় মনে করার প্রবণতা থাকলেও আইনগতভাবে দুটির উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া এক নয়।
কোনো ঘটনা থানায় সাধারণভাবে নথিভুক্ত করা এবং কোনো আমলযোগ্য অপরাধের বিষয়ে এজাহার করা—দুটি ভিন্ন বিষয়। তাই কোন পরিস্থিতিতে জিডি করতে হবে আর কখন এজাহার করতে হবে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
জিডি কী?
জিডি বা General Diary (সাধারণ ডায়েরি) হলো থানায় কোনো ঘটনা, অভিযোগ, তথ্য বা আশঙ্কা নথিভুক্ত করার একটি প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশ পুলিশের নিয়ম অনুযায়ী থানার সাধারণ ডায়েরিতে বিভিন্ন ঘটনা, অভিযোগ ও তথ্য নথিভুক্ত করা হয়।
যেমন—মোবাইল ফোন, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র বা অন্য কোনো জিনিস হারিয়ে গেলে, কেউ হুমকি দিলে, কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হলে বা ভবিষ্যতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী জিডি করা যেতে পারে।
তবে জিডি করা মানেই মামলা হয়ে যাওয়া নয়।
জিডি মূলত কোনো ঘটনা বা তথ্যকে পুলিশের নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করার একটি উপায়। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন হলে এই নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এজাহার বা এফআইআর কী?
এজাহারকে ইংরেজিতে First Information Report (FIR) বলা হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য থানায় পাওয়ার পর তা লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করার বিধান রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য মৌখিকভাবে দেওয়া হলেও পুলিশ তা লিখিতভাবে গ্রহণ করবে এবং তথ্যদাতাকে পড়ে শোনানোর পর তার স্বাক্ষর নেবে।
আমলযোগ্য অপরাধ বলতে এমন অপরাধকে বোঝায়, যার ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে।
এ ধরনের অপরাধের সংবাদ পেলে পুলিশ আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়াই তদন্ত করতে পারে।
অর্থাৎ, কোনো আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে থানায় প্রথম তথ্য দেওয়া এবং তা এজাহার হিসেবে লিপিবদ্ধ করা ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।
জিডি ও এজাহারের মূল পার্থক্য কী?
জিডির মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো ঘটনা, তথ্য, অভিযোগ বা আশঙ্কাকে থানার সাধারণ ডায়েরিতে নথিভুক্ত করা। অন্যদিকে, এজাহারের উদ্দেশ্য হলো আমলযোগ্য অপরাধের বিষয়ে থানায় পাওয়া প্রথম তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ করা।
জিডি করলেই সাধারণত ফৌজদারি মামলা শুরু হয় না। কিন্তু কোনো আমলযোগ্য অপরাধের বিষয়ে এজাহার হলে সেটির ভিত্তিতে ফৌজদারি মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
তাই জিডিকে শুধু ‘মামলার আগের ধাপ’ হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। আবার এজাহারকে সাধারণ অভিযোগ বা তথ্য জানানোর সঙ্গে এক করে দেখারও সুযোগ নেই।
জিডি করলেই কি মামলা হয়ে যায়?
সংক্ষেপে উত্তর—না।
কেউ থানায় জিডি করলেই তার অভিযোগের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা হয়ে যায় না।
তবে জিডিতে উল্লেখ করা ঘটনা থেকে যদি আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে পুলিশ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। জিডির বিষয়বস্তু এবং পরবর্তী অনুসন্ধান বা তদন্তে যদি অপরাধের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাহলে পৃথকভাবে মামলা বা তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
অর্থাৎ, শুধু জিডির নম্বর পাওয়া মানেই মামলা হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও সহজ হবে।
ধরা যাক, কেউ কোথাও নিজের মোবাইল ফোন হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি থানায় গিয়ে বিষয়টি জিডি করতে পারেন।
কিন্তু যদি তিনি জানান যে, কয়েকজন ব্যক্তি ভয় দেখিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে, তাহলে ঘটনাটি শুধু ‘মোবাইল হারানো’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে অপরাধের প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে এবং ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী আমলযোগ্য অপরাধের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
অর্থাৎ ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
নিখোঁজ ব্যক্তির ক্ষেত্রে কি শুধু জিডি যথেষ্ট?
এ ক্ষেত্রেও ঘটনার প্রকৃতি বুঝতে হবে। কেউ স্বাভাবিকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন এবং কোনো অপরাধের তথ্য বা সন্দেহ নেই—এমন পরিস্থিতিতে জিডি করা হতে পারে।
কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে যদি অপহরণ, জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া বা অন্য কোনো অপরাধের নির্দিষ্ট তথ্য থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু সাধারণ নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
তখন সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
তাই গুরুতর অপরাধের স্পষ্ট তথ্য থাকলে শুধু জিডি করে অপেক্ষা না করে পুলিশের কাছে ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণ দেওয়া জরুরি।
আমলযোগ্য ও আমল-অযোগ্য অপরাধ কী?
আইনের ভাষায় অপরাধের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিবিভাগ হলো cognizable বা আমলযোগ্য এবং non-cognizable বা আমল-অযোগ্য অপরাধ।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, যে অপরাধে পুলিশ আইন অনুযায়ী ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তার করতে পারে, সেটি আমলযোগ্য অপরাধ। আর যে অপরাধে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তার করতে পারে না, সেটি আমল-অযোগ্য অপরাধ।
আমল-অযোগ্য অপরাধের তথ্য থানায় দেওয়া হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৫ ধারায় তা নথিভুক্ত করার এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যাওয়ার বিধান রয়েছে। এ ধরনের মামলায় ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া পুলিশ তদন্ত করতে পারে না।
থানায় গেলে কী করবেন?
কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে জিডি করবেন নাকি মামলা করবেন—এ বিষয়ে নিশ্চিত না হলে ঘটনার সম্পূর্ণ ও সঠিক বিবরণ পুলিশকে জানানো উচিত।
বিশেষ করে গুরুতর অপরাধের ঘটনা হলে শুধু ‘জিডি করে রাখুন’—এমন পরামর্শে থেমে না গিয়ে অভিযোগটি কোন ধরনের অপরাধের মধ্যে পড়ে, তা পুলিশের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
আপনি যদি মনে করেন ঘটনাটি আমলযোগ্য অপরাধ, তাহলে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করার অনুরোধ করতে পারেন।
আইন অনুযায়ী আমলযোগ্য অপরাধের সংবাদ থানায় দেওয়া হলে সেটি যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করার বিধান রয়েছে।
জিডি হলো কোনো ঘটনা, তথ্য, অভিযোগ বা আশঙ্কা থানার নথিতে লিপিবদ্ধ করার একটি প্রক্রিয়া। আর এজাহার হলো আমলযোগ্য অপরাধের প্রথম তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ করার প্রক্রিয়া।
তাই জিডি করলেই মামলা হয়ে যায় না। আবার কোনো ঘটনায় জিডি করা হলেও পরবর্তী সময়ে অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী মামলা বা তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঘটনাটি কী, অপরাধের প্রকৃতি কী এবং প্রযোজ্য আইনে পুলিশ কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে। তাই গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু জিডি করে বসে না থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
আইনজীবী রেজাউল করিম বলেন, ‘আইনি সহায়তা নিতে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয় জিডি এবং এজাহার নিয়ে। অনেকেই মনে করেন জিডি করলেই বোধহয় পুলিশের কাছে মামলা হয়ে গেল। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।’
একজন আইনজীবী হিসেবে আমি সবসময় বলি—‘আপনার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রকৃতি বুঝে আইনি পদক্ষেপ নেওয়াটা সবচেয়ে জরুরি। অনেকেই থানায় গিয়ে অপরাধের শিকার হয়েও অজ্ঞতাবশত বা পুলিশের পরামর্শে শুধু ‘জিডি’ করে চলে আসেন। এটি আপনার মামলার শক্তি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। তাই অপরাধের শিকার হলে কেবল জিডি করে বসে থাকবেন না। ঘটনার স্পষ্ট বিবরণ দিয়ে সেটি এজাহার বা মামলা হিসেবে রেকর্ড করার দাবি জানান, যাতে আপনি সঠিক বিচার পেতে পারেন।’
আইনবার্তা২৪ ডেস্ক 













