আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী পুনর্মূল্যায়নের পর পাঁচ করবর্ষের বিপরীতে ৬৬৬ কোটি টাকা প্রদেয় কর দাবি ঘিরে কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণের করা দুটি রিট খারিজ করে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।
আজ সোমবার (১২ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৩২ পৃষ্ঠা ও ১৫ পৃষ্ঠার পৃথক দুটি রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিট দুটি খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেছিলেন।
রায়ের মূল পর্যবেক্ষণ ও আইনি ব্যাখা
পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেন, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ধারা ১২১এ(৪বি) অনুযায়ী, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণ যখন ধারা ৭৫(২)(ডি)(৩)-এর অধীনে রিট পিটিশনে উল্লিখিত করবর্ষগুলোর রিটার্ন দাখিল করেছিল, তখন আইনগতভাবেই ধারা ৭৪ অনুযায়ী প্রদেয় কর পরিশোধ করতে তারা বাধ্য ছিল।
আদালত স্পষ্টভাবে জানান, গ্রামীণ টেলিকমের উৎসকর পরিশোধকে নিজেদের পরিশোধ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার কোনো আইনি সুযোগ গ্রামীণ কল্যাণের ছিল না।
এছাড়া, আয়কর অধ্যাদেশের ১৭৩ ধারা কর কমিশনারকে নিজ উদ্যোগে ভুল সংশোধনের স্পষ্ট ক্ষমতা প্রদান করেছে। পূর্ববর্তী আদেশ দেয়ার ১৩ দিনের মধ্যে যথাযথ নোটিশ ও শুনানির সুযোগ দিয়েই কর কমিশনার এই সংশোধন করেছেন। তবে শুনানিকালে গ্রামীণ কল্যাণের প্রতিনিধি উক্ত করবর্ষগুলোর বিপরীতে প্রদেয় কর পরিশোধের কোনো বৈধ প্রমাণ দাখিল করতে পারেননি।
সংক্ষুব্ধ আদেশে কোনো আইনগত ত্রুটি বা অবৈধতা না থাকায় রুল খারিজ করা হলো এবং পূর্বে দেয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হলো। একই সাথে রিট আবেদনকারীর কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ে অবিলম্বে ডিমান্ড নোটিশ জারি করতে কর কমিশনারকে নির্দেশ দেয়া হলো।
মামলার দীর্ঘ আইনি পথ পরিক্রমা
২০১৭ সাল: ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত মোট পাঁচ করবর্ষের ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণ হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট করে।
২০২৩ সাল: হাইকোর্ট শর্তসাপেক্ষে ৬০ দিনের মধ্যে গ্রামীণ কল্যাণকে আপিল করার সুযোগ দিয়ে রায় দেন।
২০২৪ সালের মার্চ: এনবিআরের আবেদনের প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ হাইকোর্টকে মূল রিটের ওপর পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন।
২০২৪ সালের আগস্ট: হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রিট খারিজ করলেও পরবর্তীতে আইনি ত্রুটির (বেঞ্চের একজন বিচারক পূর্বে সরকারপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করায়) কারণে রায় প্রত্যাহার করেন। পরে প্রধান বিচারপতি মামলাটি নতুন বেঞ্চে পাঠান।
২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর: পুনঃশুনানি শেষে নতুন হাইকোর্ট বেঞ্চ রিট দুটি খারিজ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পাওনা বহাল রাখেন।
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ ও আপিলের প্রস্তুতি
গত ১০ সেপ্টেম্বরের হাইকোর্টের রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ জানান, এনবিআরের ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট ৩০ দিন সময় দিয়ে রাজস্ব আদায়ের ডিমান্ড নোটিশ জারি করবে।
অন্যদিকে, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ জানিয়েছেন, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (সিপি) দায়ের করা হবে।
আদালত প্রতিবেদক 












