বিদেশে কাজ করতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিকের কাছ থেকেই নিয়োগকর্তা বা কফিল নিরাপত্তার অজুহাতে পাসপোর্ট রেখে দেন। অনেক সময় শ্রমিক নিজেও অচেনা পরিবেশ, ভাষার সমস্যা কিংবা চাকরি হারানোর ভয়ে কোনো প্রতিবাদ না করে নীরবে মেনে নেন। কিন্তু পাসপোর্ট অন্য কারো কাছে থাকলে শ্রমিকের চলাফেরা, চাকরি পরিবর্তন, দেশে ফেরার প্রস্তুতি কিংবা আইনি ও প্রশাসনিক সাহায্য নেওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি আরও গুরুতর রূপ নেয় যখন নিয়োগকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে পাসপোর্ট ফেরত দিতে অস্বীকার করেন এবং শ্রমিককে কাজ করতে বাধ্য করার কিংবা দাসত্বে বাঁধার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা—আইএলও (ILO) পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট আটকে রাখাকে ‘জোরপূর্বক শ্রমের’ একটি অন্যতম প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ সূচক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রবাসী শ্রমিকের জন্য পাসপোর্ট কেবল একটি কাগজের বই নয়; এটি তার মৌলিক আন্তর্জাতিক পরিচয় ও ভ্রমণের একমাত্র আইনি দলিল। এটি নিজের কাছে না থাকলে একজন প্রবাসী প্রতিনিয়ত নানামুখী বাস্তব ও আইনি সংকটের মুখে পড়েন:
পরিচয় সংকটে পড়া: রাস্তাঘাটে বা যেকোনো প্রশাসনিক প্রয়োজনে পরিচয়পত্র বা বৈধ ভ্রমণ নথি দেখাতে ব্যর্থ হলে গ্রেপ্তার বা জরিমানা হতে পারে।
জরুরি প্রয়োজনে বাধা: হঠাৎ দেশে ফেরার প্রয়োজন কিংবা ভ্রমণ করার পরিস্থিতি তৈরি হলে আইনি জটিলতা দেখা দেয়।
কাজের স্বাধীনতা হরণ: চাকরি পরিবর্তন বা কর্মসংস্থান সংক্রান্ত চুক্তি নবায়নের প্রক্রিয়া আটকে যায়।
আইনি সুরক্ষার অভাব: দূতাবাস বা স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সহজে গিয়ে সাহায্য চাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
মানসিক চাপ ও জিম্মিদশা: নিয়োগকর্তা যখন ইচ্ছাকৃতভাবে পাসপোর্ট আটকে রাখেন, তখন শ্রমিকের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়।
আইএলও-র নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কর্মীর পাসপোর্ট নিয়োগকর্তার কাছে কেবল অতি-ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে এবং কর্মীর প্রকৃত ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতিতে নিরাপদে রাখার বিধান থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে যেকোনো সময় চাওয়ামাত্র তা কোনো শর্ত ছাড়াই ফেরত পেতে বাধ্য থাকবে।
পাসপোর্ট আটকে রাখা অধিকাংশ দেশে বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। কোনো একটি দেশের নিয়ম অন্য দেশে একইভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে, তবে কয়েকটি প্রধান প্রবাসী কল্যাণভিত্তিক দেশের চিত্র তুলে ধরা হলো:
সংযুক্ত আরব আমিরাতে সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, কর্মীর পাসপোর্ট তার নিজের কাছে রাখা মৌলিক অধিকারের অংশ। সেখানে নিয়োগকর্তার পাসপোর্ট জব্দ করা সম্পূর্ণরূপে বেআইনি এবং এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো নিয়োগকর্তা অ-সৌদি কর্মীর পাসপোর্ট, রেসিডেন্স পারমিট (আকামা) বা মেডিকেল ইনস্যুরেন্স কার্ড আটকে রাখতে পারবেন না। এটি শ্রম আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
কাতারের ক্ষেত্রেও সরকারি প্রশাসনিক বিধান বলছে, নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাজের প্রয়োজন ছাড়া বা কর্মীর নিজস্ব লিখিত অনুরোধের কারণ ব্যতীত নিয়োগকর্তা কর্মীর পাসপোর্ট রেখে দিতে পারবেন না। এমনকি কর্মী সুরক্ষার জন্য রাখতে দিলেও, তিনি চাওয়ামাত্রই তা ফেরত দিতে হবে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী, অভিবাসী কর্মীর অধিকার রক্ষা ও নিয়োগকারী এজেন্সির দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা আছে। তবে বিদেশে থাকাকালীন এই সমস্যার সমাধানে সেই দেশের স্থানীয় আইন এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রধান ভূমিকা পালন করে।
যদি কোনো প্রবাসী শ্রমিকের পাসপোর্ট নিয়োগকর্তা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে নিচে উল্লিখিত পদ্ধতিগুলো ধাপে ধাপে অনুসরণ করা উচিত:
লিখিত দাবি জানানো: প্রথমে মৌখিকভাবে ও অত্যন্ত শান্তভাবে পাসপোর্ট ফেরত চান। সম্ভব হলে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ, ইমেইল বা লিখিত চিঠির মাধ্যমে ফেরত চান, যাতে পরবর্তীতে প্রমাণ হিসেবে এই যোগাযোগের নথি পেশ করা যায়।
জরুরি নথিপত্রের ডিজিটাল ও কাগজের কপি রাখা: বিদেশে পাড়ি জমানোর পূর্বেই পাসপোর্টের বায়ো পেজ, ভিসা, রেসিডেন্স পারমিট, চাকরির চুক্তিপত্র, নিয়োগপত্র, নিয়োগকর্তার নাম-ঠিকানা, রিক্রুটিং এজেন্সির বিস্তারিত তথ্য এবং বেতন পরিশোধের রসিদগুলোর একাধিক কপি নিজের কাছে এবং দেশে বিশ্বস্ত পরিবারের সদস্যের কাছে সংরক্ষণ করুন।
বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ : লিখিত দাবিতেও কাজ না হলে এবং একই সঙ্গে বেতন বকেয়া রাখা, শারীরিক নির্যাতন বা দেশে ফিরতে বাধা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি ঘটলে অবিলম্বে স্বাগতিক দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের শ্রম উইংয়ে যোগাযোগ করুন।
স্থানীয় শ্রম মন্ত্রণালয় বা আদালতে অভিযোগ: মধ্যপ্রাচ্য সহ অধিকাংশ দেশে শ্রম অধিদপ্তরের নিজস্ব অনলাইন অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। পাসপোর্ট আটকে রাখা যদি স্থানীয় আইনের পরিপন্থী হয়, তবে শ্রম আদালতে অভিযোগ দায়ের করে আইনি প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের সরকারি হেল্পলাইন বা কল সেন্টারে সাহায্য: প্রবাসী কর্মী নিজে অথবা দেশে থাকা তার স্বজনেরা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ‘প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার’-এর টোল-ফ্রি নম্বর ১৬১৩৫ (বাংলাদেশ থেকে) অথবা বিদেশ থেকে সরাসরি +৮৮ ০৯৬১০ ১০২ ০৩০ নম্বরে ফোন করে সরকারের আইনি সহায়তা গ্রহণ করতে পারেন।
রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ: যেসব এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী বিদেশে গেছেন, তাদের লাইসেন্স নম্বর, চুক্তিপত্র ও ফি প্রদানের রসিদ সাথে রাখুন। দেশে গিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা যেতে পারে।
পাসপোর্ট আটকে রাখার পাশাপাশি যখন বেতন না দেওয়া, অবাধ চলাচলে বাধা সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা চাকরি ছাড়তে না দেওয়ার মতো অমানবিক আচরণ যোগ হয়, তখন এটি আন্তর্জাতিকভাবে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ হিসেবে গণ্য হয়।
অনেক সময় অতিষ্ঠ হয়ে শ্রমিক কর্মস্থল থেকে পালিয়ে যান। কিন্তু আইনি কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে হুট করে কর্মস্থল ত্যাগ করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আপনি অবৈধ হয়ে পড়তে পারেন এবং আপনার বিরুদ্ধে কফিল কর্তৃক ‘পলাতক’ বা ‘হুরুব’ (Huroob) মামলা দায়েরের সুযোগ তৈরি হয়। তাই পালিয়ে না গিয়ে সর্বদা আইনি সংস্থা বা দূতাবাসের সাহায্য নেওয়া নিরাপদ।
বিদেশে যাওয়ার আগে কিছু জরুরি সতর্কতা:
চাকরির শর্তাবলী, বিশেষ করে বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি ও ওভারটাইমের নিয়ম ভালোভাবে পড়ে ও বুঝে নিন। ভাষা বুঝতে না পারলে বা চুক্তিপত্র স্পষ্ট না হলে কোনো অস্পষ্ট নথিতে সই করবেন না। ভ্রমণের সময় মূল পাসপোর্টের অন্তত ৩-৪টি সত্যায়িত কপি ও স্ক্যান করা কপি সাথে রাখুন। বাংলাদেশ দূতাবাস, স্থানীয় পুলিশ এবং প্রবাসবন্ধু হেল্পলাইনের যোগাযোগের নম্বরগুলো সব সময় কাছে রাখুন।
পাসপোর্ট হলো আপনার মৌলিক নাগরিক অধিকার ও পরিচয়। প্রবাসে আপনি কেবল নিজের শ্রম বিক্রি করতে গিয়েছেন, নিজের আত্মসম্মান, স্বাধীনতা কিংবা মৌলিক মানবিক অধিকার বিসর্জন দিতে নয়। অধিকার সম্পর্কে সচেতন হোন এবং যেকোনো অন্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে প্রতিবাদ করুন।
অ্যাডভোকেট অরুনিমা অনন্যা 












