প্রশ্ন: আমি একজন হিন্দু নারী। আমার স্বামী আমাকে ও আমাদের সন্তানকে ফেলে রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তিনি এখন আমাদের কোনো ভরণপোষণ দিচ্ছেন না। এমনকি বিয়ের সময় পাওয়া আমার গয়না ও উপহার সামগ্রীও নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। এই অবস্থায় আমি কী আইনি পদক্ষেপ নিতে পারি? আমি কি বিবাহবিচ্ছেদ পেতে পারি?
কল্পনা রানী ঘোষ, দিনাজপুর
আইনি পরামর্শ ও সমাধান
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও হিন্দু ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী, আপনার অধিকার এবং আইনি পদক্ষেপের সার্বিক বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
হিন্দু নারীর বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার
বাংলাদেশে প্রচলিত সাধারণ হিন্দু ব্যক্তিগত আইনে সরাসরি বিবাহবিচ্ছেদের সুযোগ বেশ সীমিত। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে পৃথক বসবাস, নিয়মিত ভরণপোষণ এবং নিজের সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার জন্য আইনি লড়াই করার পূর্ণ সুযোগ রয়েছে। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলেই সরাসরি বিবাহবিচ্ছেদ মিলবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট প্রথা ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করে পারিবারিক আইনে অভিজ্ঞ আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নেওয়াই ভালো।
পৃথক বাসস্থান ও ভরণপোষণ দাবি
‘হিন্দু বিবাহিতা নারীর পৃথক বাসস্থান ও ভরণপোষণ আইন, ১৯৪৬’-এর ২ ধারা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু কারণে একজন হিন্দু নারী স্বামী থেকে আলাদা থেকেও নিয়মিত ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন। কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম:
স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে;
স্ত্রীকে না জানিয়ে বা অসম্মতিতে পরিত্যাগ করলে;
স্ত্রীর ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন/নিষ্ঠুর আচরণ করলে;
বাড়িতে অন্য কোনো নারী বা উপপত্নী রাখলে।
যেহেতু আপনার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন এবং আপনাদের পরিত্যাগ করেছেন, তাই এই আইনের আওতায় আপনি আদালতে মামলা করে নিজের ও সন্তান উভয়ের জন্যই নিয়মিত ভরণপোষণ ও আলাদা বাসস্থানের খরচ আইনগতভাবে আদায় করতে পারবেন।
বিয়ের গয়না ও উপহার (স্ত্রীধন) ফেরত পাওয়ার উপায়
বিয়ের সময় বা তার পরে নারী যে গয়না, অর্থ বা উপহারসামগ্রী পান, তা তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি (স্ত্রীধন)। স্বামী তা আটকে রাখলে সেটি বেআইনি।গয়না ও উপহার আপনার নিজস্ব সম্পত্তি প্রমাণের জন্য ক্রয় রসিদ, ছবি, উপহারের তালিকা ও সাক্ষীদের তথ্য সংরক্ষণ করুন। স্বামী তা ফেরত দিতে অস্বীকার করলে আইনি বিজ্ঞপ্তির (Legal Notice) মাধ্যমে বা উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের করে তা উদ্ধারের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
সন্তানের ভরণপোষণ ও অভিভাবকত্ব
পিতা হিসেবে সন্তানকে ভরণপোষণ দেওয়া, তার শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা স্বামীর বাধ্যতামূলক আইনি দায়িত্ব। স্বামী সন্তানকে পরিত্যাগ করলেও সন্তানের এই অধিকার ক্ষুণ্ন হয় না। এছাড়া সন্তান কার জিম্মায় বা হেফাজতে থাকবে, সে বিষয়ে আদালত সবসময় সন্তানের শারীরিক ও মানসিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
আপনি এখন কী করবেন?
তথ্য ও প্রমাণের ফাইল তৈরি করুন: বিয়ের প্রমাণ (ছবি বা নিবন্ধনের কপি), সন্তানের জন্মনিবন্ধন, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের প্রামাণ্য তথ্য/ছবি, আটকে রাখা গয়নার তালিকা/রসিদ এবং ভরণপোষণ না দেওয়ার তথ্যসমূহ গুছিয়ে রাখুন।
পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন: পারিবারিক বা হিন্দু আইনে অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে দ্রুত স্বামীকে আইনি নোটিশ পাঠান এবং পৃথক বাসস্থান ও ভরণপোষণের মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি নিন।
সরকারি বিনামূল্যে আইনি সহায়তা (লিগ্যাল এইড): আইনজীবী নিয়োগের আর্থিক সামর্থ না থাকলে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার সরকারি হেল্পলাইন ১৬৪৩০-এ কল করে বিনা খরচে আইনি সেবা ও সরকারি উকিলের সহায়তা নিন।
নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করুন: শারীরিক নির্যাতন বা হুমকির আশঙ্কায় থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ থানায় জিডি করুন অথবা জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করুন।
এটি সাধারণ সচেতনতামূলক তথ্য। নির্দিষ্ট আইনি সিদ্ধান্তের জন্য অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর সরাসরি পরামর্শ গ্রহণ করুন।
আইন বার্তা ডেস্ক 












