জমি কেনা প্রতিটি মানুষের জীবনের অন্যতম বড় আর্থিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত। সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে জমি কেনার পর যদি দেখা যায় দলিলটি জাল, বিক্রেতা প্রকৃত মালিক নন, কিংবা জমিটি নিয়ে আদালতের মামলা ও আর্থিক দায় রয়েছে—তবে চরম বিপদে পড়তে হয়।
অনেকের মনেই ভুল ধারণা থাকে যে, হাতে থাকা রঙিন ও সিল-স্বাক্ষরযুক্ত দলিলটি দেখলেই বুঝি সব ঠিক আছে। বাস্তবতা হলো, জমির দলিল দৃশ্যত ‘আসল’ হওয়া আর বিক্রেতার ‘বৈধ মালিকানা’ থাকা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। নিবন্ধিত দলিলের সত্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দলিলের মালিকানা-ধারাবাহিকতা, খতিয়ান, নামজারি, দাগ-মৌজা এবং জমির ওপর কোনো দায় বা বিরোধ আছে কি না—সবই ধাপে ধাপে যাচাই করা জরুরি।
Registration Act, 1908-এর ৫৭ ধারা অনুযায়ী, নির্ধারিত ফি দিয়ে রেজিস্টার বই ও ইনডেক্স পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট এন্ট্রির সার্টিফাইড কপি (নকল) পাওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে। জমি রেজিস্ট্রির পর আফসোস না করে কেনার আগেই জালিয়াতি এড়াতে অনুসরণ করুন ৮টি যাচাই পদ্ধতি।
কেন দলিল ও স্বত্ব যাচাই জরুরি? কাগজপত্র হাতে পেলেই জমি নিরাপদ ভাবা একটি মস্ত বড় ভুল। বর্তমান সময়ে একই জমি একাধিকবার বিক্রি, আধুনিক প্রযুক্তিতে ভুয়া সিল-স্বাক্ষর দিয়ে জাল দলিল তৈরি, জালিয়াত চক্রের ভুয়া মালিক সেজে রেজিস্ট্রি, কিংবা উত্তরাধিকারদের হঠিয়ে তথ্য গোপনের ঘটনা অহরহ ঘটছে।
একবার ভুল বা ভুয়া দলিলে জমি কেনা হয়ে গেলে পরে সেই নামজারি বাতিল বা আইনি জটিলতা নিরসন করতে কয়েক বছর ধরে আদালতের চত্বরে ঘুরতে হয়। তাই জমি কেনার মূল নীতি হওয়া উচিত—‘আগে পূর্ণাঙ্গ আইনি যাচাই, তারপর লেনদেন ও রেজিস্ট্রি।’
জমি বা প্লট কেনার আগে কী কী যাচাই করবেন? ১১টি জরুরি বিষয়
জমির দলিল ও স্বত্ব যাচাইয়ের ৮টি ধাপ
১. মূল দলিলের প্রাথমিক বিবরণ ও আইনি তথ্যাদি পড়ুন প্রথমেই বিক্রেতার দেওয়া দলিলের ভাষা, নাম, দাগ, মৌজা, জমির পরিমাণ এবং বিক্রেতা ও ক্রেতার পরিচয় নিবিড়ভাবে পড়ুন। রেজিস্ট্রেশন আইনের ৬০ ধারা অনুযায়ী, রেজিস্ট্রেশনের পর দলিলে ‘registered’ কথাটি উল্লেখসহ রেজিস্ট্রি বইয়ের নম্বর, পৃষ্ঠার তথ্য, নিবন্ধন কর্মকর্তার স্বাক্ষর, সিল ও তারিখ থাকার বিধান রয়েছে।
দলিলটি পড়ার সময় মূলত নিচের বিষয়গুলো নোট করুন:
- দলিল নম্বর, নিবন্ধনের তারিখ ও সন।
- সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম।
- দাতা (বিক্রেতা) ও গ্রহীতা (ক্রেতা)-এর নাম, পিতা/স্বামীর নাম ও পূর্ণ ঠিকানা।
- মৌজা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও চার সীমানা।
- মালিকানার মূল উৎস (সাফ কবলা, দানপত্র, ওয়ারিশ বা বণ্টননামা)।
- রেজিস্ট্রেশন বই নম্বর ও পৃষ্ঠা নম্বর।
২. সাব–রেজিস্ট্রি অফিসে মূল রেকর্ড মিলিয়ে দেখা এটি দলিল যাচাইয়ের সবচেয়ে কার্যকর ধাপ। কেবল দলিলের ওপরের সিল-স্বাক্ষর দেখে নিশ্চিত হওয়া বিপজ্জনক, কারণ এগুলো সহজেই নকল করা সম্ভব।
Registration Act-এর ৫৭ ধারা অনুযায়ী, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে মূল রেজিস্টার (বালাম বই) ও ইনডেক্স তল্লাশি করা যায়। দলিলে থাকা তথ্যগুলো—যেমন দলিল নম্বর, তারিখ, বিক্রেতার নাম, দাগ ও জমির পরিমাণ—রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষিত বালাম বইয়ের সঙ্গে শতভাগ মিলছে কি না পরীক্ষা করুন। সামান্য অমিল পাওয়া গেলেও বিস্তারিত খোঁজ না নিয়ে লেনদেন করবেন না।
৩. রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সার্টিফাইড কপি (নকল) তোলা দলিলটি সত্যিই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আইনগতভাবে নিবন্ধিত হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার চূড়ান্ত উপায় হলো বালাম বই থেকে সার্টিফাইড কপি বা ‘নকল’ তোলা।
রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের ৬০ ধারা অনুসারে, এই নিবন্ধন সনদ আইনের দৃষ্টিতে দলিলের সত্যতার শক্ত প্রমাণ বহন করে। তবে মনে রাখবেন, সার্টিফাইড কপি পাওয়া মানে কেবল এটি নিশ্চিত হওয়া যে দলিলটি রেজিস্ট্রি রেকর্ডে রয়েছে। এটি কিন্তু নিজে থেকেই প্রমাণ করে না যে বিক্রেতা জমির একক ও শতভাগ নির্ভেজাল মালিক।
৪. বায়া দলিল দেখে মালিকানার ধারাবাহিকতা পরীক্ষা বর্তমান বিক্রেতা কীভাবে এই জমির মালিক হলেন—তা জানাই মালিকানা অনুসন্ধানের মূল চাবিকাঠি। বিক্রেতা যদি পূর্বে কারও কাছ থেকে জমিটি কিনে থাকেন, তবে সেই আগের দলিলটিই হলো ‘বায়া দলিল’। তিনি যদি উত্তরাধিকারসূত্রে পান, তবে ফারায়েজ অনুযায়ী ওয়ারিশান সনদ ও বণ্টননামা দেখতে হবে।
৫. খতিয়ান (পর্চা), দাগ ও মৌজার তথ্য মেলানো দলিলে উল্লিখিত জমির বিবরণ সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মেলানো অত্যন্ত জরুরি। জমিটি কোন জরিপের অন্তর্ভুক্ত—CS, SA, RS, নাকি সর্বশেষ BS/BSN?
শুধুমাত্র একটি সাম্প্রতিক খতিয়ান দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, পূর্ববর্তী জরিপের খতিয়ানগুলোর ধারাবাহিকতা ঠিক আছে কি না দেখুন। বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-পর্চা পোর্টালে (eporcha.gov.bd) বা সরকারি ভূমিসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইনে ডিজিটাল রেকর্ড ও ম্যাপ পরখ করা যায়।
৬. বিক্রেতার নামে সর্বশেষ নামজারি যাচাই জমি হস্তান্তরের পর বিক্রেতার নামে নামজারি বা মিউটেশন সম্পন্ন হওয়া বাধ্যতামূলক। বিক্রেতার নামে পৃথক খতিয়ান তৈরি হয়েছে কি না এবং নামজারির পর নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করুন।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের ই-নামজারি পোর্টালে (mutation.land.gov.bd) নামজারির খতিয়ান ও ডি.সি.আর (DCR) অনলাইনে পরখ করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে, নামজারি শুধুই সরকারি খাজনা আদায়ের একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা, এটি এককভাবে চূড়ান্ত মালিকানা প্রমাণ করে না। তাই দলিলের সঙ্গে নামজারি মিলিয়ে দেখাই নিরাপদ।
৭. বন্ধক, দেওয়ানি মামলা বা অন্য কোনো আর্থিক দায় তল্লাশি অনেক সময় জমি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া থাকে, অথবা জমিটি নিয়ে আদালতে দেওয়ানি বা স্বত্ব স্বাব্যস্তের মামলা বিচারাধীন থাকে।
- সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দায়মুক্তি সনদ বা Non-Encumbrance Certificate (NEC) সংগ্রহ করে নিশ্চিত হন যে জমিটি দায়মুক্ত।
- স্থানীয় ভূমি অফিস ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে জমিটি নিয়ে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা চলছে কি না তা অনুসন্ধান করুন।
- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তব দখল যাচাই। কাগজে একজনের নাম আর বাস্তবে জমি দখল করে আছে অন্য জন—এমন হলে সেই জমিতে হাত দেওয়া ঠিক হবে না।
৮. বিক্রেতার এনআইডি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও স্বাক্ষর যাচাই বিক্রেতার নাম, বাবার নাম, মাতার নাম এবং এনআইডি (NID) নম্বর দলিলের তথ্যের সঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খ মেলান। সমাজে একই নামে একাধিক ব্যক্তি থাকতে পারেন, তাই কেবল নাম মিললেই নিশ্চিত হওয়া যায় না।
বিক্রেতা যদি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা ক্ষমতাপত্র অথবা কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমে জমি বিক্রি করতে চান, তবে সেই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে আইনগতভাবে নিবন্ধিত কি না এবং দাতা জীবিত আছেন কি না—তা আলাদাভাবে যাচাই করা বাধ্যতামূলক।
জমি রেজিস্ট্রেশনে নতুন নিয়ম: অনলাইনেই হবে দলিল নিবন্ধন
অনলাইনে জমি যাচাইয়ের আইনি সীমাবদ্ধতা ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন ডিজিটাল পোর্টাল এবং ১৬১২২ হেল্পলাইন প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার জন্য বেশ সুবিধাজনক। তবে অনলাইনে তথ্য প্রদর্শিত হওয়া মানেই পুরোপুরি নিষ্কণ্টক জমি নয়। ডিজিটাল রেকর্ডের তথ্য পাওয়ার পর সেটির অফিসিয়াল সার্টিফাইড কপি (নকল) উত্তোলন এবং বালাম বইয়ের রেকর্ড হাতে-কলমে মিলিয়ে দেখাই আইনসিদ্ধ।
কয়েক লাখ বা কোটি টাকার সম্পদ কেনার সময় সামান্য কিছু আইনি সার্চিং ফি সাশ্রয় করতে গিয়ে আইনি যাচাই বাদ দেওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। একজন অভিজ্ঞ ভূমি আইন বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে বায়া দলিল অনুসন্ধান, রেজিস্ট্রি অফিসে রেকর্ড সার্চিং এবং খতিয়ানের ধারাবাহিকতা চূড়ান্ত মূল্যায়ন করালেই কেবল বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ মামলা থেকে শতভাগ সুরক্ষিত থাকা সম্ভব।
অ্যাড. শৌনক কিংশুক 













