একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির সারের ডিলারশিপ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ রেখে সরকারের প্রণীত নীতিমালার কার্যকারিতার ওপর হাইকোর্টের দেওয়া স্থিতাবস্থার আদেশ স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। ফলে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’ অনুযায়ী ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আপাতত আইনি বাধা থাকছে না।
বুধবার (৭ অক্টোবর) আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবা জুঁই। রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ইকরামুল হক টুটুল।
সরকারের নতুন ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’-এ একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে সারের ডিলারশিপ থাকার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
সরকারের বক্তব্য, সার বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, পারিবারিক একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও স্বজনপ্রীতি কমানো এবং কৃষকের কাছে সঠিকভাবে সার পৌঁছে দেওয়াই নতুন নীতিমালার অন্যতম উদ্দেশ্য।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও ২০২৬ সালের সমন্বিত সার ডিলার নীতিমালা বাস্তবায়নের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালার একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির ডিলারশিপ-সংক্রান্ত বিধান চ্যালেঞ্জ করে পাঁচ ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করেন।
রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট বিধানের কার্যকারিতার ওপর স্থিতাবস্থা দেন। এর ফলে নতুন নীতিমালার আওতায় ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় ওই রিটকারীদের বিদ্যমান ডিলারশিপ নিয়ে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন না করার সুযোগ তৈরি হয়।
পরে হাইকোর্টের ওই আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।
বুধবার সেই আবেদনের শুনানি হয়। উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে চেম্বার বিচারপতি হাইকোর্টের দেওয়া স্থিতাবস্থার আদেশ স্থগিত করেন।
এর ফলে নতুন সার ডিলার নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং এর আওতায় ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে হাইকোর্টের ওই স্থিতাবস্থার বাধা আপাতত থাকল না।
তবে চেম্বার আদালতের এই আদেশকে নীতিমালার বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মূল রিটের পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে পারে।
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ২০০৯ সালের সার ডিলার ও সার বিতরণ নীতিমালায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ডিলার হওয়ার বিষয়ে এমন বাধ্যবাধকতা ছিল না।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে বা পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে একাধিক ডিলারশিপ তৈরি করে পারিবারিকভাবে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
এ ধরনের পারিবারিক একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করতেই নতুন নীতিমালায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ডিলারশিপের ওপর বিধিনিষেধ আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, নতুন নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং কৃষক যাতে সার পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিড়ম্বনা বা কৃত্রিম সংকটের মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা।
সরকারের পক্ষ থেকে নতুন সার ডিলার নীতিমালার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
সার বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা;
একই পরিবারের একাধিক ডিলারশিপের মাধ্যমে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমানো;
ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের সুযোগ কমানো;
সার বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা;
কৃষকের কাছে নির্ধারিত পদ্ধতিতে সার পৌঁছে দেওয়া;
কৃত্রিম সংকট ও বাজারে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা।
চেম্বার আদালতের আদেশের ফলে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার পথ আপাতত পরিষ্কার হয়েছে।
একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ডিলারশিপ থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নতুন নীতিমালার বিধান অনুযায়ী কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ডিলারশিপ বাতিল বা বহাল রাখার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও নীতিমালার নির্দিষ্ট শর্তের ওপর নির্ভর করবে।
অন্যদিকে সরকারের প্রত্যাশা, পারিবারিক একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমলে সার বিতরণ ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে এবং কৃষকরা সময়মতো সার পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পাবেন।
সহজভাবে বললে, হাইকোর্ট নতুন নীতিমালার সংশ্লিষ্ট বিধানের কার্যকারিতার ওপর যে স্থিতাবস্থা দিয়েছিলেন, চেম্বার আদালত আপাতত সেই আদেশ স্থগিত করেছেন।
অর্থাৎ, হাইকোর্টের স্থিতাবস্থার কারণে যে বাধা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত থাকছে না এবং সরকার নতুন নীতিমালা অনুযায়ী ডিলার নিয়োগের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারবে।
সারের মতো কৃষি উপকরণের সরবরাহব্যবস্থা সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মাধ্যমে বাজার বা সরবরাহব্যবস্থায় অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ তৈরি হচ্ছে কি না—এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে বিদ্যমান ডিলারদের অধিকার, নতুন নীতিমালার বৈধতা এবং কৃষকের স্বার্থ—এই তিনটি বিষয় সমন্বয় করেই পরবর্তী প্রশাসনিক ও বিচারিক সিদ্ধান্ত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
আদালত প্রতিবেদক 












