ঢাকা ০৪:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo লালবাগ কেল্লা: ছুটির দিনে হারিয়ে যান মুঘল ইতিহাসের অসমাপ্ত দুর্গে Logo দুর্নীতিমুক্ত আদালত গঠনে প্রধান বিচারপতিকে এক মাসের আল্টিমেটাম Logo ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের নির্দেশ হাইকোর্টের Logo রিট খারিজ, ছবি ছাড়া করা যাবে না জাতীয় পরিচয়পত্র Logo যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ড: আবুল কালাম আযাদের আপিল শুনানি ৪ সপ্তাহ মুলতবি Logo ব্যবসায়ীদের মতামত নিয়েই কোম্পানি আইন সংশোধন: বাণিজ্যমন্ত্রী Logo বাংলাভাষী মুসলিম নারীকে বাংলাদেশে পুশব্যাক:আসাম সরকারকে ২ লাখ রুপি জরিমানা Logo পাস হলো মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিকার বিল Logo সন্তানকে দানের পরও সম্পত্তিতে বাবা-মায়ের ভোগাধিকার, আইন পাস Logo বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি: সফলতার পূর্ণাঙ্গ ও ব্যবহারিক নির্দেশিকা

বাবার আহাজারি: ‘ঋণ শোধ হলো না, বুক খালি হয়ে গেল’

পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন লক্ষ্মীপুরের দুই ভাই—ফয়েজ আহমেদ সজীব (২৯) ও ফরহাদ হোসেন সুজন (২১)। কিন্তু সৌদি আরবের ধুলোবালি আর মরুভূমির খাঁ খাঁ রোদে তাদের সেই স্বপ্ন দীর্ঘ হলো না। দাম্মামের এক নির্মম সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে গেল দুটি তাজা প্রাণ। জীবিকার লড়াইয়ে যাওয়া দুই ভাইকে শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে হলো দুটি নিথর কফিনে। পাশাপাশি দুই ভাইকে চিরবিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো গ্রাম।

আজ মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার গনিপুর গ্রামের কামারহাট মসজিদ মাঠে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় দুই ভাইকে। জানাজা ও দাফনের সময় স্বজন, এলাকাবাসী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের আকাশ-বাতাস।

চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার গনিপুর গ্রামের খলিফার বাড়ির আবদুল মালেকের দুই সন্তান ছিলেন সজীব ও সুজন। বড় ভাই সজীব অনেক দিন ধরেই সৌদি আরবের দাম্মামে খেজুরের ব্যবসা করতেন। একটু সচ্ছলতার আশায় চলতি বছরের শুরুতে ছোট ভাই সুজনকেও নিজের কাছে ডেকে নিয়েছিলেন তিনি। কে জানত, এই প্রবাসজীবনই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে!

গত ১৫ জুলাই রাতের ঘটনা। খেজুরবোঝাই একটি পিকআপে করে বাগান থেকে ফেরার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি সজোরে ধাক্কা খায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাক-লরির সঙ্গে। মুহূর্তেই সব শেষ—ঘটনাস্থলেই না ফেরার দেশে চলে যান দুই ভাই।

বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বাবা আবদুল মালেক বলেন, ‘ঋণ করে দুই ছেলেকে সৌদি পাঠাইছিলাম। ভাবছিলাম, তারা কষ্ট করে সংসারের অভাব ঘুচাবে, ধারের টাকা শোধ করবে। কিন্তু সেই ঋণ তো শোধ হলো না, আমার বুকই খালি হয়ে গেল! আমার দুই ছেলে আর নাই। এমন অভিশপ্ত দিন দেখতে হবে, আমি কল্পনাও করি নাই।’

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকাল সোমবার রাতে যখন তাঁদের কফিনবন্দী মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন চারদিকে শুরু হয় মাতম। একনজর দেখার জন্য ছুটে আসেন শত শত মানুষ। আজ সকালে জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও এলাকার হাজারো মুসল্লি।

বড় ভাই সজীবের সংসার আলো করে ছিল তাঁর দুই বছর বয়সি একমাত্র সন্তান ও স্ত্রী। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম দুই সদস্যকে একসঙ্গে হারিয়ে এই পরিবারটি এখন অথৈ সাগরে।

সজীব ও সুজন সম্পর্কে প্রতিবেশীরা জানান, তারা অত্যন্ত ভদ্র ও পরিশ্রমী ছিলেন। তাঁদের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো গনিপুর গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন নিপা গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ‘একসঙ্গে দুই ভাইয়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক।’

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

লালবাগ কেল্লা: ছুটির দিনে হারিয়ে যান মুঘল ইতিহাসের অসমাপ্ত দুর্গে

বাবার আহাজারি: ‘ঋণ শোধ হলো না, বুক খালি হয়ে গেল’

আপডেট সময় ০৫:৩৩:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন লক্ষ্মীপুরের দুই ভাই—ফয়েজ আহমেদ সজীব (২৯) ও ফরহাদ হোসেন সুজন (২১)। কিন্তু সৌদি আরবের ধুলোবালি আর মরুভূমির খাঁ খাঁ রোদে তাদের সেই স্বপ্ন দীর্ঘ হলো না। দাম্মামের এক নির্মম সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে গেল দুটি তাজা প্রাণ। জীবিকার লড়াইয়ে যাওয়া দুই ভাইকে শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে হলো দুটি নিথর কফিনে। পাশাপাশি দুই ভাইকে চিরবিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো গ্রাম।

আজ মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার গনিপুর গ্রামের কামারহাট মসজিদ মাঠে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় দুই ভাইকে। জানাজা ও দাফনের সময় স্বজন, এলাকাবাসী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের আকাশ-বাতাস।

চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার গনিপুর গ্রামের খলিফার বাড়ির আবদুল মালেকের দুই সন্তান ছিলেন সজীব ও সুজন। বড় ভাই সজীব অনেক দিন ধরেই সৌদি আরবের দাম্মামে খেজুরের ব্যবসা করতেন। একটু সচ্ছলতার আশায় চলতি বছরের শুরুতে ছোট ভাই সুজনকেও নিজের কাছে ডেকে নিয়েছিলেন তিনি। কে জানত, এই প্রবাসজীবনই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে!

গত ১৫ জুলাই রাতের ঘটনা। খেজুরবোঝাই একটি পিকআপে করে বাগান থেকে ফেরার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি সজোরে ধাক্কা খায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাক-লরির সঙ্গে। মুহূর্তেই সব শেষ—ঘটনাস্থলেই না ফেরার দেশে চলে যান দুই ভাই।

বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বাবা আবদুল মালেক বলেন, ‘ঋণ করে দুই ছেলেকে সৌদি পাঠাইছিলাম। ভাবছিলাম, তারা কষ্ট করে সংসারের অভাব ঘুচাবে, ধারের টাকা শোধ করবে। কিন্তু সেই ঋণ তো শোধ হলো না, আমার বুকই খালি হয়ে গেল! আমার দুই ছেলে আর নাই। এমন অভিশপ্ত দিন দেখতে হবে, আমি কল্পনাও করি নাই।’

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকাল সোমবার রাতে যখন তাঁদের কফিনবন্দী মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন চারদিকে শুরু হয় মাতম। একনজর দেখার জন্য ছুটে আসেন শত শত মানুষ। আজ সকালে জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও এলাকার হাজারো মুসল্লি।

বড় ভাই সজীবের সংসার আলো করে ছিল তাঁর দুই বছর বয়সি একমাত্র সন্তান ও স্ত্রী। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম দুই সদস্যকে একসঙ্গে হারিয়ে এই পরিবারটি এখন অথৈ সাগরে।

সজীব ও সুজন সম্পর্কে প্রতিবেশীরা জানান, তারা অত্যন্ত ভদ্র ও পরিশ্রমী ছিলেন। তাঁদের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো গনিপুর গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন নিপা গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ‘একসঙ্গে দুই ভাইয়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক।’