জমির স্বত্ব ও মালিকানা নিয়ে দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন থাকলে বিরোধপূর্ণ জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে স্বত্ব চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হওয়ার পর বিজয়ী পক্ষের অনুকূলে সেই সম্পত্তি অবমুক্ত করতে হবে। আর চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত জমির দখলের বিষয়ে সব পক্ষকে ‘স্থিতাবস্থা’ (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‘সাহাবুদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলা সংক্রান্ত দুটি রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ২২ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।
বিরোধের মূল প্রেক্ষাপট
মামলার নথি থেকে জানা যায়, বিরোধের সূত্রপাত ফরিদপুরের ৭.২৩ শতাংশ জমিকে কেন্দ্র করে। জমিটির মূল মালিক ছিলেন যমুনা চামার ও গয়ানাত চামার। বিভিন্ন হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে জমিটির মালিকানা পান অনিল কুমার দত্ত। পরবর্তীতে তার ছেলে অলোক কুমার দত্ত দানসূত্রে জমিটির স্বত্ব লাভ করেন।
১৯৯৬ সালের ৮ জুলাই নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে অলোক কুমার দত্তের কাছ থেকে জমিটি কিনে ভোগদখলে যান সাহাবুদ্দিন আহমেদ।
মামলার চতুর্থ বিবাদী মো. জাহিদুর রহমানের দাবি, ১৯৯৬ সালের ২৩ মে অলোক কুমার দত্ত তার সঙ্গে ওই জমি বিক্রির বায়নাপত্র করেছিলেন। চুক্তি বাস্তবায়নে ২০০১ সালে মামলা করে তিনি একতরফা ডিক্রি পান এবং ২০০৩ সালে আদালতের মাধ্যমে দলিল রেজিস্ট্রি করে নেন।
পরবর্তীতে সাহাবুদ্দিন আহমেদ ওই ডিক্রির বিরুদ্ধে ২০২১ সালে ফরিদপুরের জেলা জজ আদালতে আপিল করেন। আপিল শুনানির জন্য গৃহীত হলে জাহিদুর রহমান হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন (১১৫/১ ধারা) দায়ের করেন। হাইকোর্ট নতুন করে শুনানির নির্দেশ দিলে ২০২৩ সালে জেলা জজ আপিলটি গ্রহণ করেন।
এর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে জাহিদুর রহমান পুনরায় হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন করেন। সেই রিভিশনে হাইকোর্ট রুল ও অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন, যা এখনো হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন।
দুই পক্ষের আইনি যুক্তি
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী জাকির হোসেন ভূঁইয়া আদালতে বলেন, সাহাবুদ্দিন আহমেদ ১৯৯৬ সালের নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা পেয়ে ভোগদখল করছেন। ২০০১ সালের মামলায় তাকে পক্ষভুক্ত করা হয়নি। আইন অনুযায়ী আগের নিবন্ধিত দলিলই প্রাধান্য পাওয়ার কথা।
অন্যদিকে বিবাদী জাহিদুর রহমানের আইনজীবী মো. নাসির শিকদার জানান, তার মক্কেলের বায়নাপত্রটি সাহাবুদ্দিনের দলিলের আগেই সম্পাদিত হয়েছিল। আদালতের ডিক্রি ও নিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতেই তারা স্বত্ব দাবি করছেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও মূল নির্দেশনা
হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে বলেন, সংক্ষিপ্ত রিট এখতিয়ারের মাধ্যমে দলিল ও বায়নাপত্রের সত্যতা বা জটিল স্বত্ব নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত।
আইনি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্দেশ দেওয়া হয়: ১. ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে জয়ী পক্ষের অনুকূলেই কেবল বিরোধপূর্ণ অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত করবেন। ২. দেওয়ানি বিরোধ চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জমির বর্তমান দখল ও স্থিতাবস্থা কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না।
আদালতে রিটকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী জাকির হোসেন ভূঁইয়া এবং বিবাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. নাসির শিকদার ও মিতুল ভৌমিক। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মির্জা আল মাহমুদ ও আখতার হোসেন মো. আবদুল ওহাব।
আদালত প্রতিবেদক 













