কোনো ব্যক্তি একাধিক ফৌজদারি মামলায় পৃথকভাবে দণ্ডিত হলে আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া সেই সাজা একই সঙ্গে চলার বা গণনার সুযোগ নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত দিয়েছেন আদালত।
রায়ে বলা হয়েছে, পৃথক কোনো মামলায় দণ্ড দেয়ার সময় সংশ্লিষ্ট বিচারিক রায়ে ‘সাজা একই সঙ্গে চলবে’ মর্মে আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে একটি মামলার সাজা শেষ হওয়ার পরই ধারাবাহিকভাবে পরবর্তী মামলার সাজা কার্যকর হবে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিনের দায়ের করা একটি রিট আবেদন ও জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী। রায়ে রিটকারীকে দুই মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
প্রকাশিত রায় থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিন ১৮৮১ সালের নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (এনআই) অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অধীনে চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত ৬টি পৃথক মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত হন। তিনি ২০২১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তীতে অন্যান্য মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
সাজার মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও মুক্তি না দিয়ে বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়েছে—এমন দাবি করে ২০২২ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন তিনি। প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২২ সালের ১১ এপ্রিল হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং আসামিকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন।
শুনানিতে রিটকারীর আইনজীবী মো. শাহ আলম যুক্তি দেন, বিচার চলাকালীন আসামি কারাগারে ছিলেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারা অনুযায়ী বিচারাধীন কারাভোগের মেয়াদ সমন্বয় করা হলে তার সাজা ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।
বিবাদীদের পক্ষে আইনজীবী মো. সমীর সাত্তার বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারা অনুযায়ী একাধিক মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা একসঙ্গে চলার জন্য রায়ে স্পষ্ট নির্দেশ থাকতে হয়। তা না থাকলে একটির পর একটি সাজা কার্যকর হবে। বিচারিক আদালত এখানে সাজা একসঙ্গে চলার আদেশ দেননি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৩৫এ ধারা ও রেজিস্ট্রার জেনারেলের সার্কুলার অনুসারে যে নির্দিষ্ট মামলায় আসামি হেফাজতে ছিলেন, কেবল সেই মামলার বিচারাধীন কারাভোগের সময়সীমা মূল সাজা থেকে বাদ যাবে। এক মামলার হাজতবাস অন্য মামলার সাজার সাথে সমন্বয় করার সুযোগ নেই।
উভয়পক্ষের শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট রুল খারিজের আদেশ দেন। রায়ে আদালত নিম্নোক্ত নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণসমূহ ব্যক্ত করেন:
রিট আবেদনকারী এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেননি এবং বিচারিক আদালতের এখতিয়ারগত কোনো ভুল প্রমাণ করতে পারেননি। ফলে রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করে বিচারিক আদালতের ফৌজদারি রায়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।
আসামি মো. নাসির উদ্দিনকে রায়ের তারিখ থেকে দুই মাসের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে আত্মসমর্পণ না করলে নিম্ন আদালত তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করবে।
বিচার চলাকালীন কারাভোগের সময়সীমা হিসাব করতে রিটকারীর আইনজীবীকে একটি ‘ক্যালকুলেশন শিট’ প্রস্তুতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিম্ন আদালতের নথি পরীক্ষার পর উক্ত হিসাব জেল কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। কারা কর্তৃপক্ষ কেবল নির্দিষ্ট মামলার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারা অনুযায়ী বিচার চলাকালীন আটকের সময় সঠিকভাবে হিসাব করে সংশ্লিষ্ট মামলার মোট সাজা থেকে তা বিয়োগ করবে।
৩৯৭ ধারা অনুযায়ী পৃথক মামলায় বিচারিক আদালত ‘সাজা একসঙ্গে চলবে’ নির্দেশ না দিলে প্রতিটি মামলার সাজা একের পর এক ক্রমান্বয়ে কার্যকর হবে।
আদালতে রিটের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. শাহ আলম। বিবাদীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. সমীর সাত্তার ও মুহাম্মদ আলী আক্কাস চৌধুরী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মহাদ্দেস-উল-ইসলাম (টুটুল) ও মাহফুজ বিন ইউসুফ।
আদালত প্রতিবেদক 













