তালাকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অনেক দম্পতিই পরে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে আবার একসঙ্গে সংসার করতে চান। কিন্তু এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—তালাকের নোটিশ দেওয়ার পর ৯০ দিন পার হয়ে গেলে কি আগের বিয়ে নিজে থেকেই বহাল থাকে, নাকি নতুন করে নিকাহ ও কাবিননামা করতে হয়?
আবার অনেকের প্রশ্ন, ৯০ দিনের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বসবাস শুরু করলে সেটি কি তালাক প্রত্যাহার হিসেবে গণ্য হবে? আর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তালাকের ক্ষেত্রে কি একই নিয়ম প্রযোজ্য?
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও ইসলামী বিধানের আলোকে বিষয়টি বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
৯০ দিনের হিসাব শুরু হয় কখন?
বাংলাদেশে মুসলিম তালাকের ক্ষেত্রে Muslim Family Laws Ordinance, 1961-এর ধারা ৭ এ বলা হয়েছে, তালাক উচ্চারণের পর সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং তার একটি কপি অপর পক্ষকে দিতে হবে। তালাকের নোটিশ চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছানোর ৯০ দিন পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হয় না, যদি তার আগেই তা প্রত্যাহার করা না হয়।
অর্থাৎ, শুধু তালাকের কাগজ তৈরি বা অপর পক্ষকে নোটিশ দেওয়ার তারিখ ধরে ৯০ দিন গণনা করা যাবে না। আইনের ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হলো চেয়ারম্যান নোটিশটি যে তারিখে গ্রহণ করেছেন।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়েও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ধারা ৭(৩) অনুযায়ী চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর দিন থেকে ৯০ দিন পূর্ণ হলে তালাক কার্যকর হয়।
এই ৯০ দিন কেন রাখা হয়েছে?
৯০ দিনের সময়সীমার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পুনর্মিলনের সুযোগ তৈরি করা।
ধারা ৭(৪) অনুযায়ী, চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে একটি Arbitration Council বা সালিশ পরিষদ গঠন করবেন এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পুনর্মিলনের চেষ্টা করবেন।
অর্থাৎ, তালাকের নোটিশ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। আইন নির্দিষ্ট একটি সময় রেখে দিয়েছে, যাতে দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকে।
ধারা ৭(৩)-এ বলা হয়েছে, তালাক প্রত্যাহার না করা হলে ৯০ দিন শেষ হওয়ার আগে তা কার্যকর হবে না। অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তালাক প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে।
৯০ দিন পার হয়ে তালাক কার্যকর হলে কী হবে?
প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক ৯০ দিন পার হওয়ার পর কার্যকর হয়ে গেলে আগের বিবাহের অবসান ঘটে। এরপর একই স্বামী-স্ত্রী আবার সংসার করতে চাইলে সেটিকে আগের বিবাহের ধারাবাহিকতা হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না; পুনরায় বৈধ বিবাহের প্রয়োজন হবে।
Muslim Family Laws Ordinance, 1961-এর ধারা ৭(৬) স্পষ্টভাবে বলছে, এই ধারার অধীনে কার্যকর তালাকের পর স্ত্রী একই স্বামীকে পুনরায় বিয়ে করতে পারবেন—তবে যদি সেটি তৃতীয়বার কার্যকর তালাক না হয়।
অর্থাৎ, প্রথম বা দ্বিতীয় কার্যকর তালাকের পর পুনরায় দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করতে হলে নতুন করে নিকাহ বা বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে।
নতুন কাবিননামা কি করতে হবে?
হ্যাঁ। যদি আগের বিবাহ আইনগতভাবে শেষ হয়ে গিয়ে থাকে এবং পরবর্তীতে একই দুজন আবার বিয়ে করতে চান, তাহলে সেটি হবে নতুন বিয়ে।
বাংলাদেশের Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974-এর ধারা ৩ অনুযায়ী মুসলিম আইনে সম্পন্ন প্রত্যেক বিবাহ নিবন্ধন করতে হয়। ধারা ৫ অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন হলে তা সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নিবন্ধনের বিধান রয়েছে।
ফলে আগের কাবিননামাকে নতুন বিবাহের কাবিননামা হিসেবে ব্যবহার না করে নতুন বিবাহের জন্য নতুন নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্র সম্পন্ন করা উচিত।
নতুন বিবাহের সময় প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী দেনমোহর নির্ধারণ, ইজাব-কবুল এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষীসহ বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।
৯০ দিন পার হওয়ার পর শুধু একসঙ্গে থাকলেই কি বিয়ে হয়ে যাবে?
না—শুধু স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আবার একসঙ্গে বসবাস শুরু করলেই আগের বিবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়।
যদি তালাক ইতোমধ্যে আইনগতভাবে কার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য পুনরায় বৈধ বিবাহের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়।
স্ত্রী গর্ভবতী হলে কী হবে?
এ ক্ষেত্রে আইনে বিশেষ বিধান রয়েছে।
Muslim Family Laws Ordinance, 1961-এর ধারা ৭(৫) অনুযায়ী, তালাক উচ্চারণের সময় স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে ৯০ দিন শেষ হলেও সন্তান জন্ম না হওয়া পর্যন্ত, যেটি পরে ঘটে, তার আগে তালাক কার্যকর হবে না।
অতএব, গর্ভাবস্থার ক্ষেত্রে শুধু ৯০ দিন পার হয়েছে—এই কারণে তালাক কার্যকর হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
তৃতীয় কার্যকর তালাক
তৃতীয়বার তালাক কার্যকর হয়ে গেলে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুসলিম শরিয়তের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, শুধু নতুন কাবিননামা করলেই আগের স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিবাহ করা যাবে না।
কুরআনিক বিধানের আলোকে তৃতীয় তালাকের পর স্ত্রী অন্য একজন পুরুষকে স্বাভাবিক ও বৈধ বিবাহে বিয়ে করলে এবং সেই বিবাহ পরবর্তীতে স্বাভাবিকভাবে শেষ হলে, প্রযোজ্য ইদ্দত শেষ হওয়ার পর আগের স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিবাহের প্রশ্ন আসতে পারে।
এখানে পরিকল্পিত বা সাজানো তথাকথিত ‘হালালা’ বিয়ের সঙ্গে বৈধ স্বাভাবিক বিবাহকে এক করে দেখা যাবে না। এমন বিষয়ে ব্যক্তিগত ঘটনার তথ্য যাচাই করে আলেম ও আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—“৯০ দিন পার হয়েছে” বলেই প্রতিটি তালাকের ক্ষেত্রে একই আইনি ফল হবে, এমন নয়।
বিশেষ করে তালাকের নোটিশ কখন চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছেছে, ৯০ দিনের মধ্যে তা প্রত্যাহার হয়েছিল কি না, স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন কি না এবং এটি প্রথম, দ্বিতীয় না তৃতীয় কার্যকর তালাক—এসব তথ্যের ওপর আইনি অবস্থান নির্ভর করতে পারে।
তাই বাস্তব কোনো মামলায় পুরোনো কাবিননামা, তালাকের নোটিশ, চেয়ারম্যানের প্রাপ্তির প্রমাণ, সালিশ পরিষদের নথি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই না করে স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
অ্যডভোকেট ফাহমিদা সিদ্দিকা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। 














