জাতীয় সংসদে নিজ দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার বিধানসংবলিত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল নিয়ে করা রিট সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফলে আপাতত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান বহাল থাকল এবং ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে এই রিটের কারণে কোনো বাধা থাকল না।
মঙ্গলবার বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এর আগে সোমবার রিটের ওপর শুনানি শেষে মঙ্গলবার আদেশের দিন ধার্য করেছিলেন আদালত।
আদালতের আদেশের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মামুন চৌধুরী জানান, হাইকোর্ট রিটটি সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে প্রক্রিয়াধীন এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার জাতীয় সংসদের—আদালত এমন বিষয়ও উল্লেখ করেছেন বলে জানান তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ গত ১৩ আগস্ট রিটটি করেন এবং নিজেই এর পক্ষে শুনানি করেন। রিটে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করার নির্দেশনা চাওয়া হয়। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ৬ আগস্ট ঘোষিত তফসিলকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণারও আবেদন করা হয়।
রিটে আরও বলা হয়, আদালত রুল জারি করলে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ওই তফসিলের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হোক।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মামুন চৌধুরী ও আখতার হোসেন মো. আব্দুল ওয়াহাব।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ মূলত সংসদ সদস্যের দলীয় অবস্থান ও সংসদে ভোটদানের সঙ্গে তাঁর সদস্যপদ বহাল থাকার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে।
অনুচ্ছেদটিতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার পর যদি ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হবে। তবে এ কারণে তিনি পরবর্তী কোনো সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন না।
অর্থাৎ, কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার সাংবিধানিক বিধান রয়েছে।
আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে ৭০ অনুচ্ছেদকে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হিসেবে দেখা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সংসদ সদস্যদের দলীয় আনুগত্য বজায় রাখা এবং সংসদে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
তবে একই সঙ্গে এই বিধান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ায় সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও আইন প্রণয়নে ব্যক্তিগত বিবেচনার পরিসর সংকুচিত হতে পারে।
অন্যদিকে এর পক্ষে যুক্তি হলো, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও নীতির ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হয়। ফলে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সুযোগ অবাধ হলে সরকার ও সংসদের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন গত ৬ আগস্ট তফসিল ঘোষণা করে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে।
রিটে ওই তফসিলের আইনগত বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। আবেদনকারীর পক্ষ থেকে তফসিলের কার্যক্রম স্থগিত রাখার আবেদন করা হলেও হাইকোর্ট রিটটি সরাসরি খারিজ করায় এ বিষয়ে স্থগিতাদেশ বা রুল জারির কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি।
কোনো রিট সরাসরি খারিজ হলে সাধারণত আদালত আবেদনকারীর চাওয়া প্রতিকার বা রুল জারির প্রয়োজনীয় ভিত্তি খুঁজে পায়নি—এমন একটি ফলাফল তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে হাইকোর্ট ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা নিয়ে আবেদনটি গ্রহণ করে সরকারের প্রতি ব্যাখ্যা চাওয়ার পর্যায়ে যায়নি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সংবিধানের কোনো বিধান ভবিষ্যতে কখনোই চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। নতুন কোনো আইনগত প্রশ্ন, ভিন্ন তথ্য বা নতুন সাংবিধানিক পরিস্থিতি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ আইন অনুযায়ী আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে।
এটি ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দের করা প্রথম রিট নয়। এর আগে ২০১৮ সালেও তিনি একই অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলেন।
ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিভক্ত আদেশ দেন। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি রুল জারি করেন, আর অপর বিচারপতি রিটটি খারিজ করে দেন।
পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টের একটি একক বেঞ্চে পাঠান, যা তৃতীয় বেঞ্চ হিসেবে পরিচিত। ওই বছরের ১৮ মার্চ তৃতীয় বেঞ্চও রিটটি খারিজ করে আদেশ দেন।
সর্বশেষ আদেশের ফলে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বর্তমান রিটের মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অর্থাৎ, সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে আসন শূন্য হওয়ার বর্তমান সাংবিধানিক বিধান বহাল রয়েছে।
একই সঙ্গে ৬ আগস্ট ঘোষিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিলের ওপরও হাইকোর্ট কোনো স্থগিতাদেশ দেননি। ফলে আদালতের এই আদেশের কারণে ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন স্থগিত হচ্ছে না।
তবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন বা পরিবর্তনের বিষয়টি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদে আলোচিত হতে পারে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 













