আইন মানেই আদালত, মামলা, জরিমানা কিংবা কারাদণ্ড—এমন ধারণাই আমাদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইন ও আইনি ইতিহাস ঘাটলে এমন কিছু বিধান ও ঘটনা সামনে আসে, সেগুলো শুনলে রীতিমতো অবাক হতে হয়। তবে এসব ঘটনা নিয়ে ইন্টারনেটে অনেক ভুল ও অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়িয়ে আছে। তাই কোনটি প্রকৃত আইন, কোনটি ঐতিহাসিক আইনি অধিকার এবং কোনটি নিছক প্রচলিত ধারণা—তা আলাদা করে দেখা জরুরি।
ইংল্যান্ডের ‘রয়্যাল ফিশ’: তিমি ও স্টার্জন কার?
(ঐতিহাসিক রাজকীয় আইনি অধিকার)
‘রয়্যাল ফিশ’ নামে পরিচিত একটি ঐতিহাসিক রাজকীয় অধিকারের আওতায় তিমি ও স্টার্জন মাছ ব্রিটিশ রাজমুকুটের বিশেষ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই অধিকারের সঙ্গে ১৩২৪ সালে রাজা দ্বিতীয় এডওয়ার্ডের সময়কার Prerogativa Regis বিধানের সম্পর্ক রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে সমুদ্র থেকে ধরা পড়া বা উপকূলে ভেসে আসা এসব প্রাণীর ওপর রাজমুকুটের বিশেষ অধিকার ছিল। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে তিমি বা স্টার্জন ‘শুধু একটি সামুদ্রিক প্রাণী’ হলেও ব্রিটিশ আইনি ইতিহাসে এগুলোর মর্যাদা ছিল আলাদা।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে ব্রিটিশ রাজা বা রানি সমুদ্রের সব মাছের মালিক। ‘রয়্যাল ফিশ’ বলতে ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট কিছু সামুদ্রিক প্রাণীকেই বোঝানো হয়। মজার বিষয় হলো, এই অধিকার শুধু ইতিহাসের বইয়েই আটকে নেই; আধুনিক সময়েও কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজমুকুটের এই ঐতিহাসিক অধিকারের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে।
ফ্রান্সে মৃত্যুর পরও বিয়ে সম্ভব!
(বিশেষ পরিস্থিতিতে কার্যকর আইন)
মৃত্যুর পর কি কাউকে বিয়ে করা যায়? ফ্রান্সের আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে এর উত্তর—হ্যাঁ।
ফরাসি সিভিল কোডের ১৭১ ধারায় বলা হয়েছে, গুরুতর কারণ থাকলে এবং যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণে মৃত ব্যক্তির সম্মতি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট তার মৃত্যুর পরও বিয়ের অনুমোদন দিতে পারেন।
এটি সাধারণ কোনো বিয়ের ব্যবস্থা নয়; বরং অত্যন্ত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির জন্য রাখা হয়েছে। বিয়ের অনুমোদন পেলে এর কিছু আইনি প্রভাব মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর আগের দিনের তারিখ থেকে কার্যকর ধরা হয়। তবে এর মাধ্যমে জীবিত সঙ্গী স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তরাধিকারী হন না এবং কোনো বৈবাহিক সম্পত্তি ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে বলেও গণ্য করা হয় না।
জাপানের ‘মেটাবো আইন’: কোমরের মাপও যখন সরকারি স্বাস্থ্যনীতির অংশ
(স্বাস্থ্যনীতি; সরাসরি জরিমানার ধারণাটি ভুল)
জাপানের ‘মেটাবো আইন’ নামে একটি বিষয় বহু বছর ধরে ইন্টারনেটে আলোচিত। প্রচলিত গল্পে বলা হয়, নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে কোমরের মাপ বেশি হলেই জাপানের নাগরিকদের জরিমানা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা এমন নয়।
জাপান ২০০৮ সালের এপ্রিল থেকে ৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী স্বাস্থ্যবিমাভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য-নির্দেশনা ব্যবস্থা চালু করে। এর লক্ষ্য ছিল মেটাবলিক সিনড্রোমসহ জীবনযাপনজনিত রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করা ও কমানো। এই পরীক্ষার অংশ হিসেবে কোমরের পরিধি মাপাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মে স্বাস্থ্যবিমা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এই স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জীবনযাত্রা পরিবর্তনের জন্য স্বাস্থ্য-পরামর্শ দেওয়া হয়।
সৌদি আরবের রোবট সোফিয়ার নাগরিকত্ব?
(নাগরিকত্ব ঘোষণা; পূর্ণ আইনি কাঠামো স্পষ্ট নয়)
২০১৭ সালের অক্টোবরে সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সম্মেলনে ‘সোফিয়া’ নামের হিউম্যানয়েড রোবটকে সৌদি নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সৌদির সরকারি তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘সৌদিপিডিয়া’-ও সোফিয়াকে সৌদি নাগরিকত্ব পাওয়া প্রথম রোবট হিসেবে উল্লেখ করেছে।
হ্যানসন রোবোটিক্সের তৈরি সোফিয়া মানুষের মতো দেখতে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করতে পারে। তার নাগরিকত্বের ঘোষণা প্রযুক্তি ও আইনের সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।
যদি কোনো রোবট নাগরিক হয়, তাহলে তার অধিকার কী হবে? তার কি ভোটাধিকার থাকবে? সে কি সম্পত্তির মালিক হতে পারবে? কোনো ক্ষতির জন্য কি তাকে দায়ী করা যাবে? আর যদি রোবট নিজে দায়ী না হয়, তাহলে দায়ভার কার?
এসব প্রশ্নের কোনো পূর্ণাঙ্গ উত্তর সোফিয়ার নাগরিকত্বের ঘোষণার সঙ্গে দেওয়া হয়নি। ফলে সোফিয়াকে নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণা থাকলেও, তাকে মানুষের সমতুল্য পূর্ণ নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো স্পষ্ট আইনি কাঠামো প্রকাশ্যে নেই।
চাঁদে জমি কেনার আইনি স্বীকৃতি?
(বাণিজ্যিক দাবি; বৈধ জমির মালিকানা নয়)
চাঁদে জমি কেনার বিজ্ঞাপন অনেকেরই চোখে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চাঁদের জমির নামে সার্টিফিকেট বা মালিকানার কাগজ দেওয়ার দাবিও করে থাকে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব কাগজ কি সত্যিই চাঁদের জমির বৈধ মালিকানা তৈরি করে?
উত্তর হলো—না।
১৯৬৭ সালের Outer Space Treaty বা মহাকাশ চুক্তি আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইনের অন্যতম ভিত্তি। চুক্তির ২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মহাকাশ, চাঁদ ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব দাবি, দখল, ব্যবহার বা অন্য কোনো উপায়ে জাতীয় মালিকানার আওতায় আনা যাবে না।
চুক্তিটি মূলত রাষ্ট্রগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলো তাদের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মহাকাশ কার্যক্রমের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে দায়বদ্ধ।
তাই কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘চাঁদে এক একর জমি’ বিক্রি করে একটি সার্টিফিকেট দিলেও সেটি পৃথিবীর স্বীকৃত আইনি ব্যবস্থায় চাঁদের জমির বৈধ দলিল হয়ে যায় না। অর্থাৎ, চাঁদের জমির সার্টিফিকেট স্মারক হিসেবে রাখা যেতে পারে, কিন্তু সেটিকে বৈধ সম্পত্তির দলিল হিসেবে দাবি করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
আইনবার্তা২৪ ডেস্ক 














