একটি জমি নিয়ে বিরোধ, স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ না পাওয়া, অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার কিংবা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার-এমন অসংখ্য মানুষ শুধু অর্থের অভাবে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন না। অনেকেই মনে করেন, মামলা মানেই লাখ লাখ টাকা খরচ, আইনজীবীর মোটা ফি এবং বছরের পর বছর আইনি লড়াই। অথচ বাস্তবতা হলো, আর্থিকভাবে অসচ্ছল নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশ সরকার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা (লিগ্যাল এইড) দিয়ে থাকে। এই তথ্য সাধারণ নাগরিকদের কয়জনেরই বা জানা আছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান এবং প্রত্যেকেই সমান আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। এই সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ অনুযায়ী গঠন করা হয়েছে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (National Legal Aid Services Organization-NLASO)। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন এই সংস্থা দেশের প্রতিটি জেলায় অসচ্ছল মানুষের জন্য বিনামূল্যে আইনজীবী নিয়োগ, আইনি পরামর্শ, আদালতের নির্ধারিত ব্যয় বহন এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ দিয়ে আসছে।
আইনগত সহায়তা প্রদান নীতিমালা অনুযায়ী মূলত অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিরা এই সেবা পাওয়ার যোগ্য। এর মধ্যে রয়েছেন—
- হতদরিদ্র ও ভূমিহীন ব্যক্তি।
- বিধবা, স্বামী-পরিত্যক্তা ও দুস্থ নারী।
- প্রতিবন্ধী ব্যক্তি।
- অসহায় শিশু ও শিশুশ্রমিক।
- এসিড-দগ্ধ এবং সহিংসতার শিকার নারী ও শিশু।
- আর্থিকভাবে অসচ্ছল কারাবন্দি আসামি।
- মামলা পরিচালনার সামর্থ্যহীন যেকোনো নাগরিক।
তবে আবেদনকারীর আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন সংশ্লিষ্ট জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার।
লিগ্যাল এইডের জন্য আবেদন করা খুবই সহজ।
প্রথম ধাপ: নিজ জেলার জেলা জজ আদালত ভবনে অবস্থিত জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যোগাযোগ করুন। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও এ-সংক্রান্ত কমিটি রয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপ: নির্ধারিত আবেদনপত্র সংগ্রহ করে পূরণ করুন। ফরম অফিস থেকে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। চাইলে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার ওয়েবসাইট থেকেও ডাউনলোড করা যায়।
তৃতীয় ধাপ: আবেদনপত্রের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের কপি, আয়ের সনদ বা দারিদ্র্যের প্রত্যয়নপত্র, মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্র (যদি থাকে) এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি জমা দিন।
চতুর্থ ধাপ: আবেদন যাচাইয়ের পর যোগ্য বিবেচিত হলে প্যানেলভুক্ত একজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রয়োজনে আদালতের ফি, নোটিশ জারিসহ মামলার প্রয়োজনীয় ব্যয়ও লিগ্যাল এইড তহবিল থেকে বহন করা হয়।
আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ
সব বিরোধ আদালতে গিয়েই নিষ্পত্তি করতে হবে এমন নয়। পারিবারিক, দেওয়ানি ও কিছু সামাজিক বিরোধের ক্ষেত্রে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে মধ্যস্থতা বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। এতে সময়, অর্থ ও হয়রানি সবই কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে দুই পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া সম্ভব হয়।
যেসব বিষয়ে লিগ্যাল এইড সহায়তা দেয়
- ভরণপোষণ, দেনমোহর, বিবাহবিচ্ছেদ ও সন্তানের অভিভাবকত্ব।
- নারী ও শিশু নির্যাতন, যৌতুক ও পারিবারিক সহিংসতা।
- জমিজমা ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ।
- শ্রমিকের মজুরি ও শ্রম আদালতের মামলা।
- ফৌজদারি মামলায় আইনি প্রতিনিধিত্ব, জামিন ও অন্যান্য আইনগত সহায়তা।
অর্থের অভাবে যেন কেউ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন, এটাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য। তাই আইনি সমস্যায় পড়ে চুপ করে না থেকে সরকারি লিগ্যাল এইড সেবার সুযোগ নিন। মনে রাখবেন, ন্যায়বিচার কোনো দয়া নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।
আইনবার্তা ডেস্ক 














