পদত্যাগের পরপরই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করে রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইনকিলাব মঞ্চ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ একাধিক দল ও সংগঠন তার বিচারের দাবি তুলেছে। তবে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের দায়মুক্তির প্রসঙ্গ টেনে সব আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন সাহাবুদ্দিন নিজেই। পদত্যাগের পর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “কীসের বিচার করবে? সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ পড়ে দেখুক।”
এই প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের আইনি সীমানা এবং পদত্যাগের পর সাবেক রাষ্ট্রপতির গ্রেপ্তার বা বিচার সম্ভব কি না—তা বিশ্লেষণ করে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ: আইনি সুরক্ষার সীমানা কতটুকু?
বাংলাদেশ সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দুই ধরনের সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে:
- ৫১(১) অনুচ্ছেদ (দায়িত্ব পালনকালীন কাজের সুরক্ষা): পদস্থ অবস্থায় বা পরবর্তীতে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করা কোনো কাজ বা নিষ্ক্রিয়তার জন্য তাকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ ছাড়ার পরও দাপ্তরিক কাজের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা বলবৎ থাকে।
- ৫১(২) অনুচ্ছেদ (ফোজদারি সুরক্ষার সময়সীমা): আসীন রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা বা গ্রেপ্তার/কারাবাসের পরোয়ানা জারি করা যায় না। তবে এই সুরক্ষা কেবল পদে থাকা অবস্থাতেই সীমিত।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫১ অনুচ্ছেদ কোনো ব্যক্তিকে ঢালাও বা সর্বজনীন দায়মুক্তি দেয় না। দাপ্তরিক সীমার বাইরের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি, অনৈতিক আচরণ, ফৌজদারি অপরাধ কিংবা রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়ার আগের কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা প্রযোজ্য নয়। ফলে সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার কারণে ৫১(২) অনুচ্ছেদের সাময়িক ফৌজদারি সুরক্ষা হারিয়েছেন। দাপ্তরিক পরিধির বাইরের কোনো অপরাধের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি বা গ্রেপ্তার করা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান ও সাহাবুদ্দিনের বক্তব্য
পদত্যাগের পর সাহাবুদ্দিন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা লন্ডনে গোপন বৈঠক ও অন্যান্য অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক’ বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, “বিশ্ব এখন প্রযুক্তিগতভাবে এতটাই সংযুক্ত যে দূর থেকেই যোগাযোগ সম্ভব, এজন্য লন্ডনে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।“
শারীরিক অসুস্থতাকেই পদত্যাগের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা ও অটোনমিক নিউরোপ্যাথির চিকিৎসা নিতে দ্রুতই তিনি দেশে বা বিদেশে পাড়ি দেবেন। বিচারের দাবি প্রসঙ্গে সাহাবুদ্দিন বলেন, “আমি কোনো অপরাধী নই। আমি মাথা উঁচু করে দায়িত্ব পালন করেছি এবং ৫ আগস্টের সংকট সামলেছি। এসব দাবির প্রতি আমার কোনো মনোযোগ নেই।“
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। পাঁচ বছরের নির্ধারিত মেয়াদের প্রায় দুই বছর বাকি থাকতেই শারীরিক অসুস্থতার কারণ দর্শিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। তবে পদত্যাগের পর সাংবিধানিক দায়মুক্তির আইনি ব্যাখ্যা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতির বিচার ও গ্রেপ্তারের দাবি এখন দেশের আইনাঙ্গন ও রাজনীতিতে মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
আইন বার্তা ডেস্ক 

















