অনলাইন জুয়া পরিচালনার মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৫ কোটি টাকা লেনদেন করা একটি চক্রের মূলহোতাসহ ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের কাছ থেকে সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে গাজীপুরের একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট এবং কুমিল্লার একটি আবাসিক হোটেলে পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
গ্রেপ্তার হওয়া চক্রের প্রধান হলেন মো. আরিফুল ইসলাম (২৩)। অপর পাঁচ আসামি হলেন—মো. আরমান হোসেন (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আবদুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ (২৩) ও মশিউর রহমান (২০)।
উদ্ধারকৃত আলামত:
৬,৬০০টি এমএফএস (বিকাশ/নগদ/রকেট) অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিম কার্ড।
৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সাধারণ সিম কার্ড ও ৭০টির বেশি মোবাইল হ্যান্ডসেট।
১টি ল্যাপটপ এবং ১টি মাইক্রোবাস।
ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, চক্রের মূলহোতা আরিফুল ইসলাম অবৈধ উপার্জনের টাকায় চরম বিলাসী জীবনযাপন করতেন। ইতিপূর্বে গ্রেপ্তার হওয়া আরিফুলের বিরুদ্ধে আরও ৪টি মামলা রয়েছে। কিছুদিন আগে পূর্বাচলে তাঁর একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার পর তিনি আবারও নতুন আরেকটি বিএমডব্লিউ গাড়ি কেনেন।
আরিফুলকে গাজীপুরের যে রিসোর্ট থেকে ধরা হয়েছে, সেখানে তিনি দিনে ৫০ হাজার টাকা ভাড়ার রুমসহ মোট তিনটি রুম বুকিং দিয়েছিলেন। কোনো এক স্থানে ৪-৫ দিন থাকার পর পুলিশ অবস্থান শনাক্ত করার আগেই তিনি জায়গা পরিবর্তন করে কক্সবাজার বা অন্য কোনো নামী-দামি হোটেলে চলে যেতেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতেই তিনি এই বিলাসবহুল যাযাবর কৌশল নিতেন।
ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ডিভিশনের নিয়মিত সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই চক্রের অর্থ লেনদেনের কৌশলটি উন্মোচিত হয়:
১. এমএফএস এজেন্ট ব্যবহার: অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপগুলোতে টাকা জমা নেওয়ার জন্য এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হতো।
২. ক্রিপ্টো কারেন্সি ক্রয়: দিন শেষে জুয়ার লভ্যাংশ এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে পারসোনাল অ্যাকাউন্টে নেওয়া হতো। এরপর সেই টাকা দিয়ে বাইন্যান্স, বাইবিট বা বিটগেটের মতো ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম থেকে ক্রিপ্টো কারেন্সি (যেমন- USDT) কেনা হতো।
৩. চীনা ওয়ালেটে স্থানান্তর: কেনা ক্রিপ্টো কারেন্সি মূলত পে ক্যাশমা, গো পে, লাকি পে-র মতো অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক গেটওয়ের মাধ্যমে মূল কোম্পানির ডিজিটাল ওয়ালেটে পাঠিয়ে দেওয়া হতো।
ডিবি জানায়, বাংলাদেশে সচল জুয়ার সাইটগুলোর নিয়ন্ত্রণ মূলত চীনা নাগরিকদের হাতে। গ্রেপ্তারকৃত চক্রটি ‘গো পে’ নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে কাজ করছিল, যার মূল নিয়ন্ত্রক ‘নাতান’ নামের একজন চীনা নাগরিক। দেশীয় চক্রগুলো মূলত নির্দিষ্ট কমিশনের ভিত্তিতে এই অর্থ সংগ্রহের কাজ করে।
দেশে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, “প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশ থেকে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা অনলাইন জুয়ার সাইটগুলোর মাধ্যমে ট্রানজেকশন বা পাচার হচ্ছে।”
ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত ৬ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের মাধ্যমে ৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















