বিয়েতে নির্ধারিত দেনমোহর পরিশোধ ও আদায়ের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট করতে একটি বিস্তারিত নীতিমালা প্রণয়নের প্রশ্নে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দেনমোহর নিয়ে বিদ্যমান ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারার অস্পষ্টতা দূর করে কেন নারীর অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা তৈরি করা হবে না—তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
এক জনস্বার্থ রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ১২ জুলাই (রবিবার) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
আদালতের এই রুলে আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব এবং আইন কমিশনের চেয়ারম্যানকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাহমিদা আখতার জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি দায়ের করেন এবং আদালতে তিনি নিজেই এর পক্ষে শুনানি করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খাঁন জিয়াউর রহমান।
শুনানি চলাকালীন হাইকোর্ট বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ দিয়ে বলেন, বর্তমানে ধর্মীয় বিধান উপেক্ষা করে কেবল লোকদেখানো ও আভিজাত্য প্রকাশের জন্য অতিরিক্ত দেনমোহর নির্ধারণের এক ক্ষতিকর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আর এই প্রবণতা থেকেই পরবর্তীতে নানা ধরনের সামাজিক ও আইনি জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। দেনমোহর নির্ধারণ ও আদায়ের ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়াহ নীতির বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন আদালত।
রিটকারী আইনজীবী ফাহমিদা আখতার জানান, গত ৫ জুলাই দেনমোহর সংক্রান্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন যুক্ত করে তিনি এই রিটটি করেন। তিনি বলেন, “আমাদের সমাজে অধিকাংশ বিয়ের ক্ষেত্রে বিয়ের সময় দেনমোহর পরিশোধের রেওয়াজ খুবই কম। কেবল বিবাহবিচ্ছেদের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেই দেনমোহর আদায়ের বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর যখন দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করা হয়, তখন মুদ্রাস্ফীতির কারণে সেই টাকার প্রকৃত বাজারমূল্য আর আগের মতো থাকে না। সময়ের ব্যবধান বিবেচনা না করে এভাবে পুরনো অঙ্কের টাকা পরিশোধ করা নারীদের জন্য বৈষম্যমূলক এবং এটি দেনমোহরের মূল উদ্দেশ্যেরই পরিপন্থী।”
রিট আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শরিয়াহ আইনে নারীদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য দেনমোহরের মতো ইতিবাচক বিধান থাকলেও আইনি অস্পষ্টতা, আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নারীরা এর সঠিক সুফল পাচ্ছেন না। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল নারীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দেনমোহর যেহেতু একজন বিবাহিত নারীর আইনগত অধিকার, তাই কেবল সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে তা ব্যর্থ হতে দেওয়া যায় না। নারীদের আর্থিক সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই এই বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 













