সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর কোনো কর্মচারী যদি নির্ধারিত ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন, তবে তিনি কোনো ধরনের পেনশন বা অবসরকালীন সুবিধা পাবেন না বলে চূড়ান্ত রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
গতকাল সোমবার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত ২৮ পৃষ্ঠার এক পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) আপিল বিভাগের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন।
প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় গঠিত এই বিশেষ বিচারিক প্যানেলের নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
২০২১ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া একটি রায়ের বিরুদ্ধে আইন মন্ত্রণালয় আপিল করলে, তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে এই রায় দিলেন আপিল বিভাগ। ২০২১ সালে হাইকোর্ট এক রায়ে সাবেক জুডিশিয়াল কর্মকর্তা ও সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান আইনজীবী মো. মাহবুব মোরশেদকে তাঁর ১৯ বছরের চাকরিজীবনের ভিত্তিতে পেনশন ও অন্যান্য বকেয়া সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সেই আদেশটি বাতিল ও আইনগতভাবে টেকসই নয় বলে ঘোষণা করলেন।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সহকারী জজ হিসেবে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন মো. মাহবুব মোরশেদ। পরবর্তীতে অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯ বছর চাকরি সম্পন্ন করে ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। এরপর পেনশনের দাবি জানালে বিষয়টি আদালতে গড়ায়।
কেন এই সিদ্ধান্ত? আপিল বিভাগের ৩টি প্রধান পর্যবেক্ষণ
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ নির্ধারিত মেয়াদের আগে পেনশন না দেওয়ার পেছনে আইনি ও প্রশাসনিক সুশাসনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেছেন:
আইনি বাধ্যবাধকতা:
বিদ্যমান সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক যোগ্যতার মেয়াদ (২৫ বছর) পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগকারী কোনো কর্মচারীকে পেনশন দেওয়ার আইনি সুযোগ নেই। আইনপ্রণেতারা যুক্তিসংগত কারণেই পদত্যাগকারীদের জন্য এমন কোনো বিধান রাখেননি। তাই আইনের বাইরে গিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশটি কার্যকরযোগ্য নয়।
সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা:
আদালত বলেন, ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই যদি অবাধে পেনশন ও অবসর-সুবিধা পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা সরকারি চাকরিতে প্রত্যাশিত শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করবে। সরকারি চাকরি কোনো স্বল্পমেয়াদি সাধারণ কর্মসংস্থান নয়, বরং এটি ধারাবাহিকতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি কাঠামোবদ্ধ পেশা।
অভিজ্ঞতা পাচার ও সাময়িক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি:
রায়ে বিচারকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কর্মকর্তারা যদি নির্ধারিত সময়ের আগেই পদত্যাগ করে পূর্ণ পেনশন সুবিধা ভোগ করতে পারেন, তবে কেউ কেউ সরকারি চাকরিকে কেবল অভিজ্ঞতা, উচ্চতর প্রশিক্ষণ, সামাজিক মর্যাদা বা আর্থিক নিরাপত্তা অর্জনের একটি ‘অস্থায়ী প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। এর ফলে পরবর্তীতে তাঁরা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য সহজেই চাকরি ছেড়ে দেবেন। এতে অকাল পদত্যাগ উৎসাহিত হবে, সরকারের জনবল পরিকল্পনা ব্যাহত হবে এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
আইনবার্তা ডেস্ক 













