ঢাকা ০৬:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo বাবার আহাজারি: ‘ঋণ শোধ হলো না, বুক খালি হয়ে গেল’ Logo টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: তদন্তে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ হাইকোর্টের Logo বেবি পাউডারে ক্যানসারের ঝুঁকি: ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে মামলা নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত জনসন অ্যান্ড জনসনের Logo বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুরের ৩ বছরের কারাদণ্ড Logo বেরোবি’র সাবেক ভিসি কলিমউল্লাহর জামিননামা মঞ্জুর, মুক্তিতে বাধা নেই Logo টুথপেস্টে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক: উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট Logo বিকাশ, নগদ ও রকেটের অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ কেন অবৈধ নয়: হাইকোর্টের রুল Logo সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই করেই সিদ্ধান্ত: আইনমন্ত্রী Logo সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের কোনো আইনি ভিত্তি দেখছে না সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo সাবেক রাষ্ট্রপতিকে কি গ্রেপ্তার করা সম্ভব? সাংবিধানিক দায়মুক্তি ও আইনি বিতর্কের ব্যবচ্ছেদ

কাবিন ও দেনমোহর: নারীর আইনি ও আর্থিক সুরক্ষার কবচ

মুসলিম বিবাহে ‘কাবিননামা’ এবং ‘দেনমোহর’ কেবল দুটি প্রচলিত শব্দ বা আনুষ্ঠানিকতা নয়। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, এই দুটি বিষয় নারীর সামাজিক, আইনি ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

অনেকেই এই দুটি বিষয়ের আসল আইনি গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কাবিননামা ও দেনমোহর কীভাবে একজন নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

. কাবিননামা: শুধুই কি একটি কাগজ, নাকি আইনি ঢাল?

অনেকে মনে করেন কাবিননামা (নিকাহনামা) হয়তো বিয়ের একটি আনুষ্ঠানিক কাগজ মাত্র। কিন্তু এটি মোটেও সাধারণ কোনো কাগজ নয়।

কাবিননামার আইনি ভিত্তি গুরুত্ব:

Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974 অনুযায়ী, বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন করা আইনি বাধ্যবাধকতা। নিবন্ধিত কাবিননামা হলো বিবাহের একমাত্র সরকারি রেকর্ড। এটি স্বামী-স্ত্রীর বৈধ বৈবাহিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় আইনি প্রমাণ। তালাক, ভরণ-পোষণ, দেনমোহর কিংবা উত্তরাধিকারসহ যেকোনো পারিবারিক সমস্যায় বা আইনি লড়াইয়ে আদালতে কাবিননামা একটি প্রধান ও শক্তিশালী লিখিত দলিল হিসেবে গণ্য হয়।

কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামসহ নির্ধারিত অন্যান্য অংশে প্রচলিত আইনের সীমার মধ্যে থেকে বিশেষ কিছু শর্ত যুক্ত করা যায়, যা নারীর সুরক্ষাকে আরও জোরদার করে। যেমন:

  • নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্ত্রীকে তালাকতাফওয়ীজ বা তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ।
  • দেনমোহরের পরিমাণ এবং তা পরিশোধের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি।
  • স্ত্রীর পড়াশোনা বা চাকরি করার স্বাধীনতা বজায় রাখার শর্ত।
  • স্ত্রী কোথায় বসবাস করবেন, সে বিষয়ে পারস্পরিক সমঝোতার শর্ত।
  • স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করতে চাইলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমতি গ্রহণ এবং সে-সংক্রান্ত শর্ত।

তবে এমন কোনো শর্ত কাবিননামায় যুক্ত করা যাবে না যা ইসলামী আইন বা দেশের প্রচলিত আইনের সরাসরি পরিপন্থী। তবে যুক্তিসঙ্গত ও বৈধ শর্তগুলো ভবিষ্যতে যেকোনো পরিস্থিতিতে নারীর অধিকার রক্ষায় আদালতে সরাসরি প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

. দেনমোহর: নারীর আর্থিক নিরাপত্তার রক্ষাকবচ

দেনমোহর (মোহরানা) কোনো দয়া বা উপহার নয়; এটি ইসলামী বিবাহ রীতি অনুযায়ী স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর জন্য একটি মৌলিক ও বাধ্যতামূলক আর্থিক অধিকার। এটি মূলত নারীর ভবিষ্যৎ আর্থিক সুরক্ষার জন্য একটি আইনি ঢাল।

দেনমোহর যেভাবে নারীকে সুরক্ষা দেয়:

ইসলামী আইন অনুযায়ী দেনমোহরের সম্পূর্ণ অর্থ স্ত্রীর একান্ত নিজস্ব সম্পত্তি। এই টাকার ওপর স্বামী, শ্বশুরবাড়ি কিংবা অন্য কারও কোনো অধিকার বা দাবি নেই। স্ত্রী যেভাবে ইচ্ছা এই অর্থ ব্যয় বা বিনিয়োগ করতে পারেন। স্বামী যদি স্বেচ্ছায় দেনমোহর পরিশোধ না করেন, তবে স্ত্রী পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ (Family Courts Act, 2023) এর অধীনে পারিবারিক আদালতে মামলা করে আইনগতভাবে তা আদায় করতে পারেন। বিবাহবিচ্ছেদ (তালাক) কিংবা স্বামীর মৃত্যু হলেও দেনমোহরের অধিকার নষ্ট হয় না। স্বামীর মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের আগে মৃত ব্যক্তির ঋণ হিসেবে দেনমোহর পরিশোধ করা হয়।

দেনমোহর নারীর জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী একটি আইনি ও আর্থিক সুরক্ষা কবচ। তবে এর বাস্তব সুফল পেতে হলে কিছু বিষয়ের দিকে নজর রাখা জরুরি:

  • বিয়ের সময়ই স্বামীর আর্থিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মত ও সম্মানজনক দেনমোহর নির্ধারণ করা উচিত।
  • অবাস্তব বা কেবল আনুষ্ঠানিকতার জন্য অতিরিক্ত দেনমোহর ধার্য করার পরিবর্তে তা কাবিননামায় লিখিতভাবে নথিভুক্ত করা এবং আদায়ের সঠিক প্রক্রিয়া জানা থাকা জরুরি।

দেনমোহর সাধারণত দুই ধরনের—তাৎক্ষণিক এবং বিলম্বিত । তাৎক্ষণিক দেনমোহর স্ত্রী চাইলে বিবাহের পরপরই দাবি করতে পারেন, আর বিলম্বিত দেনমোহর নির্ধারিত সময়, তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর আদায়যোগ্য হয়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—স্ত্রী স্বেচ্ছায় দেনমোহর মাফ করতে পারেন। তবে কোনো ধরনের চাপ, ভয়ভীতি বা প্রতারণার মাধ্যমে আদায় করা মাফ আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

কাবিননামা এবং দেনমোহর কোনো সামাজিক লোকদেখানো বিষয় নয়। এটি ধর্মীয় ও আইনি—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। সচেতনতার অভাবে অনেক নারী তাদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তাই বিয়ের শুরুতেই কাবিননামার প্রতিটি শর্ত মনোযোগ দিয়ে পড়া, সঠিক নিয়মে তা নিবন্ধন করা এবং দেনমোহরের অধিকার নিশ্চিত করা প্রত্যেক নারীর আইনি ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।

Tag :

বাবার আহাজারি: ‘ঋণ শোধ হলো না, বুক খালি হয়ে গেল’

কাবিন ও দেনমোহর: নারীর আইনি ও আর্থিক সুরক্ষার কবচ

আপডেট সময় ০৬:১২:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

মুসলিম বিবাহে ‘কাবিননামা’ এবং ‘দেনমোহর’ কেবল দুটি প্রচলিত শব্দ বা আনুষ্ঠানিকতা নয়। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, এই দুটি বিষয় নারীর সামাজিক, আইনি ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

অনেকেই এই দুটি বিষয়ের আসল আইনি গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কাবিননামা ও দেনমোহর কীভাবে একজন নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

. কাবিননামা: শুধুই কি একটি কাগজ, নাকি আইনি ঢাল?

অনেকে মনে করেন কাবিননামা (নিকাহনামা) হয়তো বিয়ের একটি আনুষ্ঠানিক কাগজ মাত্র। কিন্তু এটি মোটেও সাধারণ কোনো কাগজ নয়।

কাবিননামার আইনি ভিত্তি গুরুত্ব:

Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974 অনুযায়ী, বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন করা আইনি বাধ্যবাধকতা। নিবন্ধিত কাবিননামা হলো বিবাহের একমাত্র সরকারি রেকর্ড। এটি স্বামী-স্ত্রীর বৈধ বৈবাহিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় আইনি প্রমাণ। তালাক, ভরণ-পোষণ, দেনমোহর কিংবা উত্তরাধিকারসহ যেকোনো পারিবারিক সমস্যায় বা আইনি লড়াইয়ে আদালতে কাবিননামা একটি প্রধান ও শক্তিশালী লিখিত দলিল হিসেবে গণ্য হয়।

কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামসহ নির্ধারিত অন্যান্য অংশে প্রচলিত আইনের সীমার মধ্যে থেকে বিশেষ কিছু শর্ত যুক্ত করা যায়, যা নারীর সুরক্ষাকে আরও জোরদার করে। যেমন:

  • নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্ত্রীকে তালাকতাফওয়ীজ বা তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ।
  • দেনমোহরের পরিমাণ এবং তা পরিশোধের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি।
  • স্ত্রীর পড়াশোনা বা চাকরি করার স্বাধীনতা বজায় রাখার শর্ত।
  • স্ত্রী কোথায় বসবাস করবেন, সে বিষয়ে পারস্পরিক সমঝোতার শর্ত।
  • স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করতে চাইলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমতি গ্রহণ এবং সে-সংক্রান্ত শর্ত।

তবে এমন কোনো শর্ত কাবিননামায় যুক্ত করা যাবে না যা ইসলামী আইন বা দেশের প্রচলিত আইনের সরাসরি পরিপন্থী। তবে যুক্তিসঙ্গত ও বৈধ শর্তগুলো ভবিষ্যতে যেকোনো পরিস্থিতিতে নারীর অধিকার রক্ষায় আদালতে সরাসরি প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

. দেনমোহর: নারীর আর্থিক নিরাপত্তার রক্ষাকবচ

দেনমোহর (মোহরানা) কোনো দয়া বা উপহার নয়; এটি ইসলামী বিবাহ রীতি অনুযায়ী স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর জন্য একটি মৌলিক ও বাধ্যতামূলক আর্থিক অধিকার। এটি মূলত নারীর ভবিষ্যৎ আর্থিক সুরক্ষার জন্য একটি আইনি ঢাল।

দেনমোহর যেভাবে নারীকে সুরক্ষা দেয়:

ইসলামী আইন অনুযায়ী দেনমোহরের সম্পূর্ণ অর্থ স্ত্রীর একান্ত নিজস্ব সম্পত্তি। এই টাকার ওপর স্বামী, শ্বশুরবাড়ি কিংবা অন্য কারও কোনো অধিকার বা দাবি নেই। স্ত্রী যেভাবে ইচ্ছা এই অর্থ ব্যয় বা বিনিয়োগ করতে পারেন। স্বামী যদি স্বেচ্ছায় দেনমোহর পরিশোধ না করেন, তবে স্ত্রী পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ (Family Courts Act, 2023) এর অধীনে পারিবারিক আদালতে মামলা করে আইনগতভাবে তা আদায় করতে পারেন। বিবাহবিচ্ছেদ (তালাক) কিংবা স্বামীর মৃত্যু হলেও দেনমোহরের অধিকার নষ্ট হয় না। স্বামীর মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের আগে মৃত ব্যক্তির ঋণ হিসেবে দেনমোহর পরিশোধ করা হয়।

দেনমোহর নারীর জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী একটি আইনি ও আর্থিক সুরক্ষা কবচ। তবে এর বাস্তব সুফল পেতে হলে কিছু বিষয়ের দিকে নজর রাখা জরুরি:

  • বিয়ের সময়ই স্বামীর আর্থিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মত ও সম্মানজনক দেনমোহর নির্ধারণ করা উচিত।
  • অবাস্তব বা কেবল আনুষ্ঠানিকতার জন্য অতিরিক্ত দেনমোহর ধার্য করার পরিবর্তে তা কাবিননামায় লিখিতভাবে নথিভুক্ত করা এবং আদায়ের সঠিক প্রক্রিয়া জানা থাকা জরুরি।

দেনমোহর সাধারণত দুই ধরনের—তাৎক্ষণিক এবং বিলম্বিত । তাৎক্ষণিক দেনমোহর স্ত্রী চাইলে বিবাহের পরপরই দাবি করতে পারেন, আর বিলম্বিত দেনমোহর নির্ধারিত সময়, তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর আদায়যোগ্য হয়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—স্ত্রী স্বেচ্ছায় দেনমোহর মাফ করতে পারেন। তবে কোনো ধরনের চাপ, ভয়ভীতি বা প্রতারণার মাধ্যমে আদায় করা মাফ আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

কাবিননামা এবং দেনমোহর কোনো সামাজিক লোকদেখানো বিষয় নয়। এটি ধর্মীয় ও আইনি—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। সচেতনতার অভাবে অনেক নারী তাদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তাই বিয়ের শুরুতেই কাবিননামার প্রতিটি শর্ত মনোযোগ দিয়ে পড়া, সঠিক নিয়মে তা নিবন্ধন করা এবং দেনমোহরের অধিকার নিশ্চিত করা প্রত্যেক নারীর আইনি ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।