দেশের সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বহাল হলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং মৌলিক বিষয়ে জনগণের মতামত যাচাইয়ের ‘গণভোট’ পদ্ধতি। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা এই পরিবর্তনগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া ঐতিহাসিক রায়টি বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ দীর্ঘ শুনানি শেষে এই সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন। এর ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাতিল হওয়া নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা আবার সংবিধানে কার্যকর হলো বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের জানান, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ড. বদিউল আলম মজুমদার এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে করা আপিলগুলো আপিল বিভাগ খারিজ করে দিয়েছেন।
হাইকোর্ট আগে পঞ্চদশ সংশোধনীর যে অংশগুলোকে (তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল ও গণভোট বিলোপ) অবৈধ ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেছিলেন, আপিল বিভাগ আজ সেই রায়টিই চূড়ান্তভাবে বহাল রাখলেন। ফলে হাইকোর্টের রায়টি এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সিলমোহর পেয়ে চূড়ান্ত আইনে পরিণত হলো।
কী ছিল এই পঞ্চদশ সংশোধনীতে?
২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাস হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে: সংবিধানে থাকা তিন মেয়াদের ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলোপ করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান করা হয়। সংবিধানের কোনো মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার ‘গণভোট’ পদ্ধতি বাতিল করা হয়।
সংবিধানে একযোগে ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়, যার মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রিট থেকে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যৌথভাবে রিট করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি। পরবর্তীতে এই মামলায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি পক্ষ অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৭ ডিসেম্বর ২০২৪ দীর্ঘ চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেন। রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ নম্বর ধারাকে (যা দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হয়েছিল) সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী ও অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
জুলাই ২০২৬ হাইকোর্টের এই রায়ের কিছু অংশ সংশোধন এবং এটি পুরোপুরি বাতিলের দাবিতে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করা হয়েছিল। চলতি সপ্তাহে টানা তিন দিন ধরে সর্বোচ্চ আদালতে এ বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। আজ বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগ সমস্ত আবেদন নিষ্পত্তি করে হাইকোর্টের রায়টিই বহাল রাখেন।
এই রায়ের ফলে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন এলো। এর বাস্তব প্রভাব দুটি। ১. নির্বাচনকালীন সরকার: আগামীতে দেশে যেকোনো সাধারণ বা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আর দলীয় সরকার দায়িত্বে থাকতে পারবে না। নির্বাচন পরিচালনার জন্য সংবিধানে বর্ণিত আগের নিয়ম অনুযায়ী একটি অনির্বাচিত, নিরপেক্ষ ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ গঠিত হবে। ২. গণভোটের অধিকার: সংবিধানের কোনো অতি গুরুত্বপূর্ণ বা মৌলিক ধারা পরিবর্তন করতে চাইলে সংসদ একতরফাভাবে তা করতে পারবে না; তার আগে দেশের সাধারণ মানুষের ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের (গণভোট) মাধ্যমে সেটির অনুমোদন নিতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 














