এখন ডিজিটাল যুগ। অনলাইনে কেনাকাটা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্যাম ঠেলে শপিং মলে যাওয়ার চেয়ে ঘরে বসে এক ক্লিকে পছন্দের পণ্য হাতে পাওয়া অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক। সুঁই থেকে শুরু করে ল্যাপটপ—সবই এখন পাওয়া যাচ্ছে ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেসে। তবে এই সুবিধার আড়ালেই সক্রিয় রয়েছে একদল প্রতারক। ‘অর্ডার করলেন প্রিমিয়াম শাড়ি, ডেলিভারি পেলেন ছেঁড়া কাপড়’ কিংবা ‘অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর বিক্রেতা আপনাকে ব্লক করে দিল’—এ ধরনের ঘটনা এখন আর বিরল নয়।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাদের কাছে বছরে জমা পড়া অভিযোগের বড় একটি অংশই অনলাইনে কেনাকাটায় প্রতারণা সংক্রান্ত। অথচ অনেকেই জানেন না, ঘরে বসেই প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অনলাইনে প্রতারণার শিকার হলে কীভাবে সহজে আইনি প্রতিকার পাওয়া যায় এবং দেশের প্রচলিত আইন ও বিধিমালা একজন ভোক্তাকে কী ধরনের সুরক্ষা দেয়, তা জানা জরুরি।
ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা-২০২১ কী বলছে?
গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা–২০২১‘ জারি করেছে। এই নির্দেশিকায় অনলাইন ব্যবসার জন্য বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনসহ প্রচলিত আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
- ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা: ক্রেতা সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করার পর সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রেতাকে পণ্যটি ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
- ডেলিভারির সময়সীমা: ক্রেতা ও বিক্রেতা একই শহরে হলে অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর সর্বোচ্চ ৫ দিনের মধ্যে এবং ভিন্ন শহরে হলে সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দিতে হবে।
- টাকা ফেরতের নিয়ম: পণ্য স্টকে না থাকলে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে বিক্রেতাকে সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে ক্রেতার অর্থ (বিকাশ, নগদ, ব্যাংক বা ব্যবহৃত পেমেন্ট মাধ্যমের মাধ্যমে) ফেরত দিতে হবে। অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কোনো চার্জ থাকলে তা বিক্রেতাকেই বহন করতে হবে।
- ডিজিটাল ওয়ালেটে অর্থ আটকে রাখা যাবে না: কোনো ক্যাশব্যাক, ডিসকাউন্ট বা প্রাপ্য অর্থ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ডিজিটাল ওয়ালেটে আটকে রাখা যাবে না। ঘোষিত অফার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর করতে হবে।
- ‘আউট অব স্টক‘ তথ্য প্রদর্শন বাধ্যতামূলক: পণ্য স্টকে না থাকলে ওয়েবসাইট বা প্ল্যাটফর্মে স্পষ্টভাবে ‘আউট অব স্টক’ উল্লেখ করতে হবে। স্টকে না থাকা পণ্যের জন্য অগ্রিম অর্থ নেওয়া যাবে না।
প্রতারণার শিকার হলে যেসব প্রমাণ সংরক্ষণ করবেন
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা আদালতে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে নিচের তথ্যগুলো সংরক্ষণ করুন—
১. অনলাইন শপ, ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট, অ্যাপ বা আইডির সঠিক লিংক (URL) ও স্ক্রিনশট।
২. বিক্রেতার সঙ্গে অর্ডারসংক্রান্ত কথোপকথন বা চ্যাটের স্ক্রিনশট।
৩. অর্থ পরিশোধের প্রমাণ, যেমন—বিকাশ, নগদ, রকেট বা ব্যাংক লেনদেনের রসিদ, ট্রানজেকশন আইডি বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট।
৪. পণ্য পেয়ে থাকলে ক্যাশ মেমো বা বিল এবং ত্রুটিপূর্ণ বা ভিন্ন পণ্যের ছবি।
অভিযোগ করার সময়সীমা
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, প্রতারণার ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ করতে হবে। নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলে সাধারণত অভিযোগ গ্রহণ করা হয় না।
যেভাবে ঘরে বসেই অভিযোগ করবেন
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে কোনো আইনজীবীর প্রয়োজন নেই এবং অভিযোগ দাখিলে কোনো ফি লাগে না। আপনি নিজেই তিনটি উপায়ে অভিযোগ করতে পারেন।
- মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে: গুগল প্লে স্টোর থেকে অধিদপ্তরের অভিযোগ গ্রহণের অ্যাপ ডাউনলোড করে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধন করুন। এরপর New Complaint অপশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সংযুক্ত করে অভিযোগ জমা দিন।
- ই–মেইলের মাধ্যমে: আপনার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, অভিযুক্ত বিক্রেতা বা পেজের নাম এবং ঘটনার বিস্তারিত লিখে স্বাক্ষর করুন। এরপর সেটির স্ক্যান কপি বা ছবি এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংযুক্ত করে nccc@dncrp.gov.bd ঠিকানায় ই-মেইল করুন।
- হটলাইন ও ফেসবুকের মাধ্যমে: সরকারি হটলাইন ১৬১২১-এ কল করে অভিযোগ জানাতে পারেন। এছাড়া জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠানো যায়।
শুধু টাকা ফেরত নয়, মিলতে পারে নগদ পুরস্কারও
অভিযোগ পাওয়ার পর জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর উভয় পক্ষকে শুনানির জন্য আহ্বান করে। অনেক ক্ষেত্রে এই শুনানি অনলাইনেও অনুষ্ঠিত হয়।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ (এক–চতুর্থাংশ) অভিযোগকারীকে পুরস্কার হিসেবে প্রদান করা হয়।
ভোক্তা অধিকার ছাড়াও রয়েছে আরও আইনি প্রতিকার
প্রতারণার পরিমাণ বড় হলে বা পরিকল্পিতভাবে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করার পাশাপাশি আরও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
- ফৌজদারি মামলা:
নিকটস্থ থানায় গিয়ে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর প্রতারণা, জালিয়াতি বা প্রযোজ্য অন্যান্য ধারায় মামলা করা যেতে পারে। - দেওয়ানি মামলা:
ক্ষতিপূরণ আদায় বা অর্থ ফেরতের দাবিতে দেওয়ানি আদালতে মামলা করা সম্ভব।
অনলাইন কেনাকাটায় সচেতন থাকুন
- অপরিচিত বা নতুন কোনো পেজ থেকে কেনাকাটার আগে তাদের রিভিউ, কাস্টমার কমেন্ট এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি যাচাই করুন।
- অস্বাভাবিক কম দামে দামি পণ্যের অফার দেখলে সতর্ক থাকুন।
- সম্ভব হলে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ না করে ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতিতে পণ্য কিনুন এবং হাতে-নাতে পণ্য দেখে মূল্য পরিশোধ করুন।
- কেনাকাটার আগে প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, যোগাযোগের ঠিকানা, রিটার্ন ও রিফান্ড নীতিমালা যাচাই করার চেষ্টা করুন।
- সচেতনতাই অনলাইন প্রতারণা থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। নিজের অধিকার জানুন, প্রমাণ সংরক্ষণ করুন এবং নিরাপদে অনলাইন কেনাকাটা করুন।
আইন বার্তা ডেস্ক 

















