নিজস্ব একটি জমি কেনার স্বপ্ন প্রায় সবারই থাকে। কিন্তু সামান্য অসাবধানতা বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই না করে জমি কিনলে সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে। দেশে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ জাল দলিল, একাধিকবার বিক্রি, ভুয়া মালিকানা কিংবা জমি সংক্রান্ত মামলার কারণে বড় ধরনের আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। জমি কেনা যেহেতু জীবনের অন্যতম বড় একটি বিনিয়োগ, তাই তাড়াহুড়ো না করে কেনার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় ধাপে ধাপে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
প্রতারণার ঝুঁকি এড়াতে জমি চূড়ান্ত করার আগে নিচে উল্লেখিত বিষয়গুলো অবশ্যই মিলিয়ে নিন:
১. মূল দলিল এবং প্রকৃত মালিকানা যাচাই
প্রথমেই নিশ্চিত হতে হবে, যিনি জমি বিক্রি করছেন তিনি আসলেই জমির প্রকৃত মালিক কি না। বিক্রেতার মূল দলিল, বায়া দলিল (পূর্ববর্তী মালিকদের দলিল) এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম ও তথ্য হুবহু মিলছে কিনা পরীক্ষা করুন। যদি অন্য কারও মাধ্যমে (প্রতিনিধি) জমি বিক্রি করা হয়, তবে তার ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ (আমমোক্তারনামা) সম্পূর্ণ বৈধ, রেজিস্ট্রিকৃত এবং বর্তমানে কার্যকর কি না—তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে যাচাই করে নিন।
২. খতিয়ান, পর্চা ও মৌজা নকশা মিলিয়ে দেখা
সিএস এসএ, আরএস বিএস বা সর্বশেষ সিটি জরিপের খতিয়ানগুলো ভালো করে মিলিয়ে দেখুন। চেইন বা ধারাবাহিকতা ঠিক আছে কিনা (অর্থাৎ এক মালিক থেকে অন্য মালিকে রেকর্ড কীভাবে গেল) তা যাচাই করুন। কাগজে থাকা জমির দাগ নম্বর ও পরিমাণ মৌজার নকশার সাথে বাস্তবে একই জায়গায় মিলছে কিনা তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট বা ভূমি অফিসের মাধ্যমে খতিয়ানটি আসল কিনা তা অনলাইনেই যাচাই করে নেওয়া যায়।
৩. নামজারি ও জমাভাগ
শুধু দলিল থাকলেই মালিকানা শতভাগ নিশ্চিত হয় না। জমিটি বর্তমান বিক্রেতার নামে ‘নামজারি’ বা মিউটেশন করা আছে কিনা এবং তার নামে আলাদা খতিয়ান ও ডিসিআর আছে কিনা তা নিশ্চিত হোন। নামজারি না থাকলে ভবিষ্যতে মালিকানা হস্তান্তর ও রেজিস্ট্রি নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
৪. হালনাগাদ খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর
জমিটির ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা সর্বশেষ বছর পর্যন্ত পরিশোধ করা আছে কিনা তা যাচাই করুন এবং হালনাগাদ খাজনার রসিদ (দাখিলা) সংগ্রহ করুন। খাজনা বকেয়া থাকলে ভূমি অফিস থেকে মালিকানা হস্তান্তরে আইনি বাধা আসতে পারে, তাছাড়া নিয়মিত খাজনা প্রদান মালিকানার ধারাবাহিকতার একটি বড় প্রমাণ।
৫. দায়মুক্ততা বা নন-এঙ্কামব্রেন্স সার্টিফিকেট
জমিটি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া হয়েছে কিনা অথবা অন্য কোনো আর্থিক দায় আছে কিনা তা যাচাই করা জরুরি। এর জন্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে তল্লাশি দিয়ে ‘নন-এঙ্কামব্রেন্স সার্টিফিকেট’ বা দায়মুক্ততার সনদ দেখে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
৬. উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে সতর্কতা
যদি জমিটি বিক্রেতা উত্তরাধিকার বা দানসূত্রে পেয়ে থাকেন, তবে সব অংশীদারের বা ওয়ারিশদের সম্মতি রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করুন। এ ক্ষেত্রে ‘ওয়ারিশন সার্টিফিকেট’ বা ওয়ারিশ সনদ এবং আইনি বন্টননামা দলিল খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে, যাতে পরবর্তীতে অন্য কোনো অংশীদার জমির দাবি না করতে পারে।
৭. মামলা ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা যাচাই
জমিটি নিয়ে আদালতে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা চলমান আছে কিনা কিংবা কোনো নিষেধাজ্ঞা (Stay Order) রয়েছে কিনা—সে বিষয়ে খোঁজ নিন। এছাড়া জমিটি সরকারি খাস জমি, অর্পিত বা পরিত্যক্ত সম্পত্তি, কিংবা রাজউক/সিডিএ বা কোনো সরকারি প্রকল্পের আওতাভুক্ত বা অধিগ্রহণকৃত কিনা—তা স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
৮. সরেজমিনে জমি পরিদর্শন ও দখল যাচাই
কেবল কাগজের ওপর নির্ভর করে কখনোই জমি কিনবেন না। সশরীরে জমিতে যান, সরকারি আমিন দিয়ে জমির পরিমাপ নকশার সাথে মিলিয়ে নিন। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জমির প্রকৃত দখল কার হাতে আছে এবং সীমানা নিয়ে কোনো বিরোধ বা রাস্তার সমস্যা আছে কিনা তা জেনে নিন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের চেকলিস্ট
জমি রেজিস্ট্রি বা বায়না করার আগে বিক্রেতার কাছ থেকে নিচের নথিগুলো অবশ্যই বুঝে নিন এবং যাচাই করুন:
- মূল দলিল (কবলা/বায়না/দানপত্র ইত্যাদি) ও বায়া দলিলসমূহ
- সর্বশেষ নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর (DCR)-এর কপি
- সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ানের কপি
- সংশ্লিষ্ট মৌজা নকশা বা ম্যাপ
- সর্বশেষ বছরের ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের রসিদ
- বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্র
- উত্তরাধিকার সূত্রে হলে ওয়ারিশ সনদ ও বন্টননামা দলিল
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বৈধ পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কপি
পরিচিত কারও কথার ওপর অন্ধবিশ্বাস বা তাড়াহুড়ো করে জমির বায়না করবেন না। জমির আর্থিক লেনদেন সবসময় ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার বা চেকের মাধ্যমে করা নিরাপদ, যাতে লেনদেনের অকাট্য প্রমাণ থাকে। দলিল নিবন্ধনের পূর্বে প্রতিটি নথি নিয়ে ভূমি অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে তথ্য সংগ্রহ করুন এবং একজন অভিজ্ঞ সিভিল আইনজীবীর আইনি মতামত নিন। সচেতন থাকুন, আপনার কষ্টের বিনিয়োগকে নিরাপদ রাখুন।
আইনবার্তা২৪ ডেস্ক 


















