দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন রোধে এক যুগান্তকারী ও কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। ১ জুলাই (বুধবার) আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশের সাথে সাথেই তা দেশজুড়ে কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৮৬৭ সালের পুরনো ‘পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হলো।
নতুন এই আইনে ডিজিটাল জুয়া পরিচালনা, ম্যাচ ফিক্সিং এবং এর প্রচারণাকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এক নজরে অপরাধ ও শাস্তির বিধান:
- সংঘবদ্ধ জুয়া ও অর্থপাচার: সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা জরিমানা।
- অনলাইন বেটিং ও ভিপিএন ব্যবহার: সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা জরিমানা।
- ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিং: ম্যাচ ফিক্সিংয়ে সর্বোচ্চ ৭ বছর জেল ও ১ কোটি টাকা জরিমানা; স্পট ফিক্সিংয়ে ৫ বছর জেল ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা। (পাশাপাশি আজীবন বা নির্দিষ্ট মেয়াদে খেলায় নিষেধাজ্ঞা)।
- ভুয়া সিম ও এমএফএস (বিকাশ/রকেট ইত্যাদি) ব্যবহার: অন্যের এনআইডি বা ভুয়া তথ্য দিয়ে জুয়া খেললে সর্বোচ্চ ৭ বছর জেল ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা।
- অনলাইন ও দূরবর্তী জুয়া: সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড অথবা ১ কোটি টাকা জরিমানা।
- বিজ্ঞাপন ও প্রমোশন (ইনফ্লুয়েন্সার/শিল্পী/খেলোয়াড়): জুয়ার বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা চালালে সর্বোচ্চ ৩ বছর জেল অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা।
- সাধারণ জুয়া: সর্বোচ্চ ২ বছর জেল বা ২ লাখ টাকা জরিমানা।
নতুন আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়ার সাথে জড়িত আধুনিক সব অপরাধের সুস্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— স্পোর্টস বেটিং, ফ্যান্টাসি ও ই-স্পোর্টস বেটিং, ভিপিএন, প্রক্সি বা মিরর সাইট ব্যবহার, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, ঘোস্ট (ভুয়া) সিম, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিং। ইন্টারনেট বা যেকোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে জুয়ার নেটওয়ার্ক তৈরি বা অর্থ লেনদেন করা এখন থেকে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস বা হুন্ডির মাধ্যমে স্থানান্তর করাকে ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’-এর আওতাভুক্ত করা হয়েছে। অপরাধে ব্যবহৃত বা অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত ব্যাংক হিসাব, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, ডোমেইন, সার্ভার, মোবাইল ও কম্পিউটার এবং জুয়ার আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত ভবন বা অফিস আদালতের মাধ্যমে সরাসরি বাজেয়াপ্ত করা হবে। কোনো কোম্পানি জড়িত থাকলে তার লাইসেন্স বাতিল এবং কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।
এই আইনের অধীনে সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে দেশের সাইবার ট্রাইব্যুনালে। সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নন, এমন পুলিশ কর্মকর্তা মামলার তদন্ত করবেন এবং তদন্তের স্বার্থে আদালতের অনুমতি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্তের ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ (স্থগিত) করতে পারবেন।
অনলাইন জুয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে সরকারকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন এবং ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং সিস্টেমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া একটি ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ’ এবং ফেসিয়াল রিকগনিশনভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালু করা হবে।
আইনটি বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিআইডি এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির সমন্বয়ে একটি বিশেষ আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 














