ঘুষ, দুর্নীতি, দালালচক্র ও দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতায় জর্জরিত দেশের ভূমি সেবাখাত। এই খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে এবং সব ধরনের অনিয়ম রুখতে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি, ‘ভূমি অ্যাপ’, অনলাইন সেবা এবং কর্মকর্তাদের ডিজিটাল উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের মতো একাধিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও বহু বছরের পুরোনো ঘুষের সংস্কৃতি ভাঙা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) সচিবালয়ে সরকারের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এবং ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ডিজিটাল ভূমি সেবায় কী কী থাকছে?
ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ (ফিজিক্যাল টাচ) কমিয়ে আনা। যত বেশি মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে সেবা নেবেন, দুর্নীতি ও হয়রানি তত কমবে।
ইতোমধ্যেই সরকারের চালু করা ‘ভূমি অ্যাপ’-এ ১ লাখের বেশি ব্যবহারকারী যুক্ত হয়েছেন। এই অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বর্তমানে যেসব সেবা মিলছে:
- ই-মিউটেশন (নামজারি) আবেদন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ।
- ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) অনলাইন পরিশোধ।
- জমির রেকর্ড যাচাই, খতিয়ান ও মৌজা মানচিত্র সংগ্রহ।
- অনলাইনে সরাসরি অভিযোগ দাখিল এবং উত্তরাধিকার হিসাব নির্ধারণ।
- ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দিতে iBAS++ প্ল্যাটফর্মের সংযুক্তি।
এছাড়াও কর্মকর্তাদের অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ‘ভূমি দৃষ্টি’ নামে একটি জিও-ফেন্সিংভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম চালুর প্রস্তুতি চলছে, যার মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তা অফিস ফাঁকি দিলে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে তা ধরা পড়বে। ডিজিটাল সেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে দেশে ৮৯৩টি সেবা কেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও মাঠপর্যায়ে দুর্নীতির চিত্র এখনো ভয়াবহ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, ভূমি খাতে দুর্নীতি আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। তাদের প্রতিবেদন অনুসারে,
ভূমি সেবা গ্রহণকারী ৬৬.২ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো দুর্নীতির শিকার হয়েছেন (যা ২০২৩ সালে ছিল ৫১%)। ৪৭.৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতি পরিবারকে গড়ে ১১ হাজার ৩১০ টাকা অবৈধভাবে দিতে হয়েছে। ভূমি খাতে ঘুষের মাধ্যমে দেশজুড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮১ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে, যা দেশের সকল সরকারি সেবা খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বিচারাধীন ৪৭ লাখের বেশি মামলার একটি বড় অংশই ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে তৈরি। গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ এখনো প্রযুক্তির চেয়ে দালালের ওপর বেশি নির্ভরশীল। তাই শুধু প্রযুক্তি নয়, কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















