ব্যবসার প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে অর্থ দাবি করাকে ‘যৌতুক’ হিসেবে গণ্য করা যাবে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। যৌতুক দাবি ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে নিম্ন আদালতের দেওয়া দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের রায় বাতিল করে মো. রাসেল উদ্দিন নামে এক আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি মো. সেলিমের একক হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় আজ প্রকাশিত হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মো. রাসেল উদ্দিনের সঙ্গে ইসমত আরা বেগমের বিয়ে হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট কক্সবাজার শহরের বাইতুশ শরফ মসজিদ রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় রাসেল উদ্দিন ব্যবসার প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে ১ লাখ টাকা দাবি করেন।
স্ত্রী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়—এমন অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন ইসমত আরা। মামলাটি বিচার শেষে ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ আসামি রাসেল উদ্দিনকে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। নিম্ন আদালতের এই দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন রাসেল।
হাইকোর্টের মূল পর্যবেক্ষণ ও আইনি ব্যাখ্যা
যৌতুকের আইনি সংজ্ঞা:হাইকোর্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২(ঞ) ধারায় যৌতুকের সংজ্ঞার কথা উল্লেখ করে বলেন—বিয়ের শর্ত বা বিবেচনা হিসেবে অর্থ বা সম্পত্তি দাবি করা হলেই তা যৌতুকের সংজ্ঞায় পড়ে। কিন্তু এ মামলায় প্রমাণিত হয়েছে, অর্থ দাবি করা হয়েছিল আসামির ব্যবসার প্রয়োজনে, যা বিয়ের শর্তের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ফলে রাষ্ট্রপক্ষ যৌতুকের অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সাক্ষ্য ও মেডিকেল সনদে অসংগতি:স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে বাদী জবানবন্দিতে বলেছিলেন তার ডান কাঁধ ও পিঠে আঘাত করা হয়েছে। তবে চিকিৎসকের দেওয়া মেডিকেল সনদে আঘাতের স্থান ছিল বাম কাঁধ। বাদীর জবানবন্দি ও মেডিকেল সনদের এই বৈপরীত্য নির্যাতনের অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে বলে পর্যবেক্ষণ দেন আদালত।
সামগ্রিক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে আসামি মো. রাসেল উদ্দিনকে খালাস দেন।
এই রায় যৌতুক ও নির্যাতন সংক্রান্ত মামলায় দুটি বড় আইনি বার্তা দেয়।
টাকা দাবির প্রকৃতি: কেবল টাকা চাইলেই তা যৌতুক হবে না; তা বিয়ের শর্ত বা বিবেচনার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা যাচাই করতে হবে।
সাক্ষ্যের সামঞ্জস্য: ফৌজদারি মামলায় মৌখিক বক্তব্যের সঙ্গে মেডিকেল সনদের বৈপরীত্য থাকলে তা আসামির অনুকূলে যাবে।
তবে আদালত স্পষ্ট করেছেন—এই রায়ের অর্থ এই নয় যে ব্যবসার জন্য স্ত্রীর কাছে টাকা চাওয়া সব পরিস্থিতিতেই আইনসম্মত, কিংবা অর্থ না দিলে নির্যাতন করা যাবে। প্রতিটি মামলার সত্যতা আইনি প্রমাণ ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
আদালত প্রতিবেদক 













