সন্তানের সাফল্যের পেছনে পিতা-মাতার অবদান অপরিসীম। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অনেক বাবা-মাকে অবহেলা ও চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। প্রবীণ বয়সে বাবা-মায়ের এই সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই বাংলাদেশ সরকার প্রণয়ন করেছে ‘পিতা–মাতার ভরণ–পোষণ আইন, ২০১৩‘।
পিতা-মাতা যখন বার্ধক্যে উপনীত হন, তখন সন্তানরাই হয়ে ওঠেন তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, সামর্থ্য থাকার পরও সন্তানরা বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে চান না। এমন পরিস্থিতি থেকে অসহায় পিতা-মাতাকে আইনি সুরক্ষা দিতে এই আইনটি ঢাল হিসেবে কাজ করে।
আইনের মূল বিষয়গুলো কী?
এই আইনের মূল কথা হলো—সন্তান কর্মক্ষম ও আর্থিকভাবে সক্ষম হলে, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ করা তার আইনি বাধ্যবাধকতা। আইনের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- সমান অধিকার: পিতা ও মাতা উভয়েই জীবিত থাকলে, সন্তানকে উভয়েরই সমানভাবে ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে।
- আলাদা থাকলেও দায়িত্ব শেষ নয়: পিতা বা মাতা যদি কোনো কারণে আলাদা বসবাস করেন, তবুও সন্তান তার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাবেন না।
- শাস্তির বিধান: কোনো সন্তান যদি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ করতে অস্বীকার করে, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
- দণ্ড বা জরিমানা: অপরাধ প্রমাণিত হলে আদালত সন্তানকে অনূর্ধ্ব ১ লক্ষ টাকা জরিমানা, অথবা অনূর্ধ্ব ৩ মাসের কারাদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারেন। শুধু তাই নয়, জরিমানার অর্থের একটি অংশ সরাসরি ভুক্তভোগী পিতা-মাতাকে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
মামলা করার সাধারণ পদ্ধতি
পিতা-মাতা যদি নিজের অধিকার আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে চান, তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
ধাপ ১ : আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ:
প্রথমে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হতে হবে। মামলার যাবতীয় তথ্য ও প্রমাণ যাচাই করে তিনি একটি অভিযোগপত্র (Complaint Petition) প্রস্তুত করবেন।
ধাপ ২. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ:
মামলার জন্য কিছু জরুরি নথি গুছিয়ে নিতে হবে। যেমন: পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র, সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ (জন্মনিবন্ধন বা পারিবারিক সনদ), সন্তানের বর্তমান ঠিকানা এবং ভরণ-পোষণ না দেওয়ার প্রমাণ (কোনো চিঠিপত্র, মেসেজ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা সাক্ষীদের তালিকা)।
ধাপ ৩.আদালতে অভিযোগ দাখিল:
এলাকাভিত্তিক বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্রটি দাখিল করতে হবে। আদালত অভিযোগ আমলে নিলে সন্তানের বিরুদ্ধে সমন জারি করবেন এবং তার বক্তব্য শুনবেন।
ধাপ ৪.সাক্ষ্য–প্রমাণ ও বিচার:
বিচার চলাকালীন উভয় পক্ষ আদালতে নিজ নিজ সাক্ষ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করবেন। মাননীয় আদালত সব নথিপত্র এবং সাক্ষীদের বয়ান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবেন।
ধাপ ৫.আদালতের রায়:
সন্তানের অপরাধ প্রমাণিত হলে আদালত আইন অনুযায়ী শাস্তি (সর্বোচ্চ ৩ মাসের জেল বা ১ লক্ষ টাকা জরিমানা অথবা উভয়) ঘোষণা করবেন এবং পিতা-মাতার নিয়মিত ভরণ-পোষণ নিশ্চিতের আদেশ দেবেন।
একটি নমুনা অভিযোগপত্র (Complaint Petition)
আইনি লড়াইয়ের জন্য আদালতে যে আবেদনটি করতে হয়, তার একটি সাধারণ খসড়া বা নমুনা নিচে দেওয়া হলো। বাস্তব মামলার ক্ষেত্রে এটি নিজ নিজ তথ্য অনুযায়ী সংশোধন করে নিতে হবে:
বাংলাদেশের আদালতে
মাননীয় বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট, ১ম শ্রেণি
……….. জেলা।
বিষয়: পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ এর ৫ ধারা অনুযায়ী অভিযোগ।
অভিযোগকারী:
নাম: ……………………………. , পিতা/স্বামী: ………………………… , ঠিকানা: ……………………………..
বনাম
অভিযুক্ত:
নাম: ……………………………. , পিতা: ……………………………. , ঠিকানা: …………………………….
অভিযোগ:
১। অভিযোগকারী অভিযুক্তের (পিতা/মাতা)।
২। অভিযুক্ত একজন প্রাপ্তবয়স্ক, কর্মক্ষম ও উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
৩। অভিযোগকারী বার্ধক্যজনিত/অসুস্থতাজনিত কারণে নিজের ভরণ-পোষণ করতে অক্ষম।
৪। অভিযোগকারী একাধিকবার অভিযুক্তের নিকট ভরণ-পোষণ দাবি করলেও অভিযুক্ত কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই ভরণ-পোষণ প্রদান করতে অস্বীকার করেছেন।
৫। অভিযুক্তের এই আচরণ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩-এর বিধান লঙ্ঘন করে এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
প্রার্থনা:
অতএব, মহামান্য আদালতের নিকট বিনীত প্রার্থনা—
১। এই অভিযোগটি আমলে গ্রহণ করা হোক।
২। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সমন জারি করা হোক।
৩। বিচার শেষে অভিযুক্তকে ধারা ৫ অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত করে আইনানুগ দণ্ড প্রদান করা হোক।
৪। আদালত অভিযোগকারীর নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান করুন।
৫। ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত যে কোনো উপযুক্ত আদেশ প্রদান করুন।
অভিযোগকারী: স্বাক্ষর ও নাম _________________ , তারিখ: ______________
আইনজীবী: স্বাক্ষর, নাম ও বার এনরোলমেন্ট নং: ______________________
মামলার সাথে যা যা সংযুক্ত করতে হবে:
- জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি ও জন্মনিবন্ধন/পারিবারিক সম্পর্কের প্রমাণ।
- প্রবীণ বাবা-মায়ের চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
- ভরণ-পোষণ দাবি করার কোনো লিখিত প্রমাণ (যদি থাকে, যেমন: লিগ্যাল নোটিশ, চিঠি, মোবাইল মেসেজ ইত্যাদি)।
- আদালতের সামনে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে পারবেন এমন সাক্ষীদের তালিকা।
আইন কেবল শাস্তির জন্য নয়, বরং সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধে একটি সতর্কবার্তা। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রবীণদের শেষ জীবনে একটি সম্মানজনক ও দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন উপহার দেওয়া।
অ্যাডভোকেট ফাহমিদা সিদ্দিকা, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ 




















