আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে কীভাবে গুম করা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন র্যাবের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের সাবেক রানার ও সেনা সদস্য ইমরুল কায়েস।
গত রোববার (২১ ২১ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনালে এই চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্য ও জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। একই সাথে জিয়াউল আহসানের ভারত-বাংলাদেশজুড়ে বিস্তৃত ‘কিলিং নেটওয়ার্ক’ এবং বিডিআর সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যার বিষয়েও বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে এই সাক্ষ্যে।
জবানবন্দিতে সেনা সদস্য ইমরুল কায়েস জানান, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি র্যাব সদর দপ্তরে প্রেষণে কর্মরত ছিলেন এবং তৎকালীন র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক জিয়াউল আহসানের ‘রানার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১২ সালের এপ্রিলের ঘটনা উল্লেখ করে ইমরুল বলেন, “১৩ এপ্রিল র্যাব সদর দপ্তর থেকে মেজর জিয়াউল, মেজর নওশাদ ও সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে যাই। গাড়িতে বসে জিয়াউল স্যার বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে ‘টার্গেট কখন আসবেন’ খোঁজ নিচ্ছিলেন। তবে ওইদিন টার্গেট না আসায় স্যারকে বাসায় নামিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন আমি ৯ দিনের ছুটিতে বাড়ি যাই।”
তিনি আরও বলেন, “ছুটি শেষে ২৩ এপ্রিল কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পর দেখি পুরো র্যাব সদর দপ্তরে থমথমে পরিবেশ। একদিন জিয়াউল স্যার ফোনে কথা বলার সময় উচ্চস্বরে বলে ওঠেন— ‘আপনাদের কথামতো ইলিয়াস আলীকে গলফ (গুম) করলাম। এখন আপনারা এরকম করলে হবে? আমি কমান্ডো মানুষ। তাহলে পোস্টিং দিয়ে জঙ্গলে পাঠিয়ে দিন।’ এছাড়া ইলিয়াস আলীকে গুমের পর র্যাব সদর দপ্তরের বেশ কিছু সিসিটিভি ফুটেজ জিয়াউল স্যার নিজ হাতে ধ্বংস করে ফেলেন।”
সাক্ষীর জবানবন্দি শেষে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, জিয়াউল আহসানের কিলিং নেটওয়ার্ক ভারত ও বাংলাদেশজুড়ে বিস্তৃত ছিল। সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে ‘জাফলং অপারেশন’ নিয়ে ভয়াবহ তথ্য দিয়েছেন।
র্যাবের টিএফআই সেল থেকে দুজন আসামিকে নিয়ে জিয়াউলের নেতৃত্বে জাফলং সীমান্তে যান সাক্ষীসহ অন্যরা। সেখানে ভারত থেকে আসা সাদা পোশাকের কিছু লোক আরও দুজন ব্যক্তিকে নিয়ে আসে এবং আসামিদের বিনিময় করা হয়। এরপর ভারত থেকে আনা ওই দুই ব্যক্তিকে রাস্তার মাঝেই মাথায় গুলি করে হত্যা করেন জিয়াউল আহসান। এই নেটওয়ার্কে ভারতের কিছু লোক বা বাহিনীর সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
বিডিআর বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ে বিডিআর সদস্যদের হত্যার বিষয়েও জবানবন্দিতে তথ্য এসেছে। চিফ প্রসিকিউটর জানান, জিয়াউল আহসান বিডিআরের অন্তত ১০-১২ জন সদস্যকে ধরে এনে দুটি পদ্ধতিতে হত্যা করতেন। কাউকে বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করে, আবার কাউকে মাথায় গুলি ঠেকিয়ে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।
রোববার সকালে কড়া নিরাপত্তায় সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় এবং তাঁর উপস্থিতিতেই এই সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলার তদন্ত ও সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে।
আইনবার্তা ডেস্ক 

















