পাওয়ার অব অ্যাটর্নি হলো এমন একটি আইনি দলিল, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি (ক্ষমতাদাতা) অপর কোনো ব্যক্তিকে (অ্যাটর্নি বা প্রতিনিধি) তার পক্ষে নির্দিষ্ট কাজ করার পূর্ণ আইনি অধিকার দেন। আইনের চোখে প্রতিনিধির কাজ মূল ব্যক্তির কাজ হিসেবেই গণ্য হয়। প্রবাসে বসবাসকারী, গুরুতর অসুস্থ বা ব্যস্ত ব্যক্তিরা সাধারণত জমিজমা, ব্যাংক, মামলা ও ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়োগ করেন। ব্যবহার করেন।
প্রধান ৩টি ধরন:
সাধারণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: সম্পত্তি দেখাশোনা, খাজনা প্রদান, ভাড়া আদায় ও ব্যাংক পরিচালনার জন্য বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়।
বিশেষ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: কেবল সুনির্দিষ্ট কোনো একক কাজ সম্পাদন করার জন্য (যেমন: নির্দিষ্ট একটি জমি বিক্রি বা একটি মামলা পরিচালনা)।
অপরিবর্তনীয় পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: প্রতিনিধির নিজস্ব আর্থিক বা স্বার্থগত অধিকার জড়িত থাকলে (যেমন: অর্থ গ্রহণের পর সম্পত্তি বিক্রির ক্ষমতা) চুক্তি আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী ক্ষমতাদাতা চাইলেই তা একতরফা বাতিল করতে পারেন না।
বিদেশে যেতে দালালের ফাঁদে পড়েছেন, আইনি প্রতিকার কি?
পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ক্ষমতা কতটুকু?
দলিলে সীমাবদ্ধ ক্ষমতা: দলিলে যে ক্ষমতার স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে, অ্যাটর্নি কেবল ততটুকুই করতে পারবেন। জমি হস্তান্তর, বিক্রি, বন্ধক বা দানের উল্লেখ না থাকলে তিনি তা করতে পারবেন না।
দায়বদ্ধতা ও সীমাবদ্ধতা: প্রতিনিধিকে মূল ব্যক্তির স্বার্থে সরল বিশ্বাসে কাজ করতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন এবং ক্ষমতার বাইরে গিয়ে করা কোনো কাজ ক্ষমতাদাতার ওপর বাধ্যতামূলক নাও হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানের যাচাই-বাছাই: সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, ব্যাংক কিংবা আদালত এসব দলিল অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করে।
আইনে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ বাঁধা নেই। মেয়াদ মূলত দলিলে কী লেখা আছে তার ওপর নির্ভর করে। তবে সাধারণত নিচের কারণগুলোতে এর কার্যকারিতা শেষ হয়:
# দলিলে নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ থাকলে তা শেষ হলে।
# যে নির্দিষ্ট কাজের জন্য এটি দেওয়া হয়েছিল, তা সম্পন্ন হলে।
# ক্ষমতাদাতা এটি বাতিল করলে।
# ক্ষমতাদাতা বা অ্যাটর্নির মৃত্যু হলে কিংবা সিদ্ধান্ত নিতে মানসিকভাবে অক্ষম হলে।
প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পরামর্শ
নিবন্ধন: জমি বিক্রির মতো কাজের ক্ষেত্রে দলিলটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধন করাতে হয়।
প্রবাসী নাগরিকদের ক্ষেত্রে: প্রবাসে থাকলে স্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাস বা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সত্যায়ন করে দেশে পাঠাতে হয় (প্রয়োজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন লাগে)।
অন্যান্য দিক: ক্ষমতা সব সময় সুনির্দিষ্ট রাখা উচিত এবং কেবল বিশ্বস্ত ব্যক্তিকেই এটি দেওয়া সমীচীন। ক্ষমতা বাতিল করলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা সংস্থাকে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিলের আইনি নিয়ম
আইন অনুযায়ী সব ধরনের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি একইভাবে বাতিল করা যায় না:
সাধারণ বা বিশেষ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: ক্ষমতাদাতা (প্রিন্সিপাল) যেকোনো সময় একক সিদ্ধান্তেই এই ক্ষমতা বাতিল বা রদ করতে পারেন।
অপরিবর্তনীয় পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: যদি অ্যাটর্নির স্বার্থ বা অর্থ জড়িত থাকে (যেমন: টাকা গ্রহণ করে ডেভেলপারকে বা অন্য কাউকে জমি বিক্রির ক্ষমতা দেওয়া), তবে একতরফাভাবে তা বাতিল করা যায় না। এ ক্ষেত্রে অ্যাটর্নির সম্মতি বা চুক্তি ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট আইনি কারণ উল্লেখ করে আদালতের আশ্রয় নিতে হয়।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বাতিলকরণের প্রক্রিয়া
যদি মূল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত (Registered) হয়ে থাকে, তবে সেটি বাতিল করার জন্যও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ‘রদকরণ দলিল’ নিবন্ধন করতে হয়।
লিখিত নোটিশ প্রদান
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি রদ করার আগে অ্যাটর্নিকে লিখিতভাবে জানানোর নিয়ম রয়েছে। আইনজীবীর মাধ্যমে একটি লিগ্যাল নোটিশ বা রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ পাঠিয়ে জানিয়ে দিতে হয় যে তাকে দেওয়া ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
অ্যাডভোকেট অরুনিমা অনন্যা 












