ঢাকা ১১:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo অভিনেত্রী তানজিন তিশার বিরুদ্ধে হুমকির নতুন মামলা, হাজির হওয়ার নির্দেশ Logo শুধু বেঞ্চ বাড়িয়ে মামলাজট কমানো সম্ভব নয়: অ্যাটর্নি জেনারেল Logo অপ্রতিম হত্যা মামলায় চার্জশিট: মোবাইল ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় খুন Logo ডিভি লটারি: বাংলাদেশিদের জন্য কী খবর, কবে আবেদন শুরু? Logo পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কী, ক্ষমতা কতটুকু ও কতদিন কার্যকর থাকে? Logo সরকারি খরচে পৌনে ৫ লাখের বেশি মামলায় মিলল আইনি সহায়তা Logo অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের আদায় করে দেওয়া হলো ৪২৫ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ Logo মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ Logo রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি মোছা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধার প্রতিবাদে হাইকোর্টে রিট Logo ৩৫ বছর বয়সের পর আর আইনজীবী হওয়ার সুযোগ নেই: আইনমন্ত্রী

ছুটির দিনে আহসান মঞ্জিল: সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার এক বিকেল

বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গোলাপি রঙের ঐতিহাসিক প্রাসাদটির দিকে তাকালেই মনে হয়, দৃশ্যপট থেকে আধুনিকতার চাদরটা বুঝি নিমেষেই সরে গেল। পুরান ঢাকার জটলা আর সরু অলিগলির কোলাহল পেরিয়ে আহসান মঞ্জিলের ফটকে পা রাখা মাত্রই চোখে ভেসে ওঠে ঢাকার নবাবদের সেই জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় দিনগুলো। ছুটির দিনে এখানে আসার অভিজ্ঞতা কেবল সাধারণ কোনো ঘুরে বেড়ানো নয়; বরং ইটের দেয়ালে জমে থাকা শত বছরের ইতিহাস আর আভিজাত্যের সঙ্গে একান্তে কিছু সময় কাটানো।

ঊনবিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে ঢাকার প্রভাবশালী নবাব খাজা আব্দুল গনি তাঁর প্রিয় পুত্র খাজা আহসানউল্লাহর নামানুসারে নির্মাণ শুরু করেন এই সুরম্য রাজপ্রাসাদ। ইন্দো-সারাসেনিক বা মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই প্রাসাদটি দীর্ঘকাল ধরে ছিল ঢাকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। সময়ের পরিক্রমায় রাজপ্রাসাদটি আজ জাদুঘরে রূপ নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর প্রতিটি তোরণে, অলঙ্কৃত দেয়ালে আর বিশালাকার গম্বুজে আজও সগর্বে বেঁচে আছে সেই রাজকীয় স্মৃতি।

শুক্রবার কিংবা শনিবারের ছুটির অলস বিকেলে আহসান মঞ্জিল প্রাঙ্গণ রূপ নেয় এক প্রাণবন্ত জনপদে। পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা মানুষ, ফ্রেমবন্দি করতে উদগ্রীব তরুণ আলোকচিত্রী আর উৎসুক দর্শনার্থীদের কোলাহলে চত্বরটি গমগম করে। কিন্তু মূল প্রাসাদের টিকিট কেটে গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই বদলে যায় আবহ। কাচের আলমারিতে সংরক্ষিত নবাবদের ব্যবহৃত দুর্লভ আসবাব, পানিপথের যুদ্ধের রাজকীয় তরবারি, শিকার করা হাতির সুবিশাল মাথার খুলি, রৌপ্যনির্মিত কারুকার্যময় সিংহাসন আর দুর্লভ আলোকচিত্র যেন এক লহমায় দর্শনার্থীকে একশ পঞ্চাশ বছর পেছনের এক জাঁকজমকপূর্ণ যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

দোতলার প্রশস্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে বুড়িগঙ্গার বুকে ভেসে চলা ডিঙিনৌকা, লঞ্চ আর দূরের কোলাহলময় শহরের দিকে তাকিয়ে থাকলে এক আশ্চর্য প্রশান্তিতে মন ভরে যায়। নগরীর এত কাছে থেকেও প্রাসাদ প্রাঙ্গণ যেন এক নিস্তব্ধ, মায়াবী দ্বীপ।

বর্ষার বিকেলে আহসান মঞ্জিলের সৌন্দর্য যেন নতুন করে ডানা মেলে। গোলাপি প্রাসাদের গম্বুজ ছুঁয়ে বুড়িগঙ্গার বুকে যখন বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়ে, তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখা এক অদ্ভুত অনুভূতি। ভেজা বাতাসের সোঁদা গন্ধ, ঐতিহাসিক গোলাপি দেয়ালের ম্লান দীপ্তি আর বৃষ্টির ঝম ঝম শব্দ—সব মিলিয়ে এক স্মৃতিকাতর ও পরাবাস্তব আবহ তৈরি হয়।

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য জরুরি তথ্য

ছুটির দিনে আহসান মঞ্জিল ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে এর নির্ধারিত সময়সূচি জেনে রাখা ভালো:

শুক্রবার: সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বন্ধ থাকে। বিকেল ৩:০০টা থেকে রাত ৮:০০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।

অন্যান্য দিন: শনি থেকে বুধবার সকাল ১০:৩০টা থেকে বিকেল ৫:৩০টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

সাপ্তাহিক বন্ধ: প্রতি বৃহস্পতিবার এবং সরকারি সাধারণ ছুটির দিনগুলোতে এটি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।

আহসান মঞ্জিল কেবল কোনো ইট-পাথরের রাজপ্রাসাদ বা শুধুই দর্শনীয় স্থান নয়; এটি ঢাকাই ঐতিহ্যের মূল শেকড়কে ছুঁয়ে দেখার এক অপার জানালা। ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিকতা থেকে একটু মুক্তি পেয়ে এখানে এলে একই সাথে ইতিহাস, অনুপম স্থাপত্যকলা আর বুড়িগঙ্গার বাতাস—তিনটির অপূর্ব মেলবন্ধন উপভোগ করা যায়। পুরান ঢাকার কোলাহল পেরিয়ে যখনই এই গোলাপি প্রাসাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন, মনে হবে সময়ের ঘড়িটা উল্টো ঘুরেছে, আর আপনি নিজেই হারিয়ে গেছেন উনিশ শতকের কোনো এক সোনালী বিকেলে।

 

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

অভিনেত্রী তানজিন তিশার বিরুদ্ধে হুমকির নতুন মামলা, হাজির হওয়ার নির্দেশ

ছুটির দিনে আহসান মঞ্জিল: সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার এক বিকেল

আপডেট সময় ০১:০১:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গোলাপি রঙের ঐতিহাসিক প্রাসাদটির দিকে তাকালেই মনে হয়, দৃশ্যপট থেকে আধুনিকতার চাদরটা বুঝি নিমেষেই সরে গেল। পুরান ঢাকার জটলা আর সরু অলিগলির কোলাহল পেরিয়ে আহসান মঞ্জিলের ফটকে পা রাখা মাত্রই চোখে ভেসে ওঠে ঢাকার নবাবদের সেই জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় দিনগুলো। ছুটির দিনে এখানে আসার অভিজ্ঞতা কেবল সাধারণ কোনো ঘুরে বেড়ানো নয়; বরং ইটের দেয়ালে জমে থাকা শত বছরের ইতিহাস আর আভিজাত্যের সঙ্গে একান্তে কিছু সময় কাটানো।

ঊনবিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে ঢাকার প্রভাবশালী নবাব খাজা আব্দুল গনি তাঁর প্রিয় পুত্র খাজা আহসানউল্লাহর নামানুসারে নির্মাণ শুরু করেন এই সুরম্য রাজপ্রাসাদ। ইন্দো-সারাসেনিক বা মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই প্রাসাদটি দীর্ঘকাল ধরে ছিল ঢাকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। সময়ের পরিক্রমায় রাজপ্রাসাদটি আজ জাদুঘরে রূপ নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর প্রতিটি তোরণে, অলঙ্কৃত দেয়ালে আর বিশালাকার গম্বুজে আজও সগর্বে বেঁচে আছে সেই রাজকীয় স্মৃতি।

শুক্রবার কিংবা শনিবারের ছুটির অলস বিকেলে আহসান মঞ্জিল প্রাঙ্গণ রূপ নেয় এক প্রাণবন্ত জনপদে। পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা মানুষ, ফ্রেমবন্দি করতে উদগ্রীব তরুণ আলোকচিত্রী আর উৎসুক দর্শনার্থীদের কোলাহলে চত্বরটি গমগম করে। কিন্তু মূল প্রাসাদের টিকিট কেটে গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই বদলে যায় আবহ। কাচের আলমারিতে সংরক্ষিত নবাবদের ব্যবহৃত দুর্লভ আসবাব, পানিপথের যুদ্ধের রাজকীয় তরবারি, শিকার করা হাতির সুবিশাল মাথার খুলি, রৌপ্যনির্মিত কারুকার্যময় সিংহাসন আর দুর্লভ আলোকচিত্র যেন এক লহমায় দর্শনার্থীকে একশ পঞ্চাশ বছর পেছনের এক জাঁকজমকপূর্ণ যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

দোতলার প্রশস্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে বুড়িগঙ্গার বুকে ভেসে চলা ডিঙিনৌকা, লঞ্চ আর দূরের কোলাহলময় শহরের দিকে তাকিয়ে থাকলে এক আশ্চর্য প্রশান্তিতে মন ভরে যায়। নগরীর এত কাছে থেকেও প্রাসাদ প্রাঙ্গণ যেন এক নিস্তব্ধ, মায়াবী দ্বীপ।

বর্ষার বিকেলে আহসান মঞ্জিলের সৌন্দর্য যেন নতুন করে ডানা মেলে। গোলাপি প্রাসাদের গম্বুজ ছুঁয়ে বুড়িগঙ্গার বুকে যখন বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়ে, তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখা এক অদ্ভুত অনুভূতি। ভেজা বাতাসের সোঁদা গন্ধ, ঐতিহাসিক গোলাপি দেয়ালের ম্লান দীপ্তি আর বৃষ্টির ঝম ঝম শব্দ—সব মিলিয়ে এক স্মৃতিকাতর ও পরাবাস্তব আবহ তৈরি হয়।

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য জরুরি তথ্য

ছুটির দিনে আহসান মঞ্জিল ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে এর নির্ধারিত সময়সূচি জেনে রাখা ভালো:

শুক্রবার: সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বন্ধ থাকে। বিকেল ৩:০০টা থেকে রাত ৮:০০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।

অন্যান্য দিন: শনি থেকে বুধবার সকাল ১০:৩০টা থেকে বিকেল ৫:৩০টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

সাপ্তাহিক বন্ধ: প্রতি বৃহস্পতিবার এবং সরকারি সাধারণ ছুটির দিনগুলোতে এটি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।

আহসান মঞ্জিল কেবল কোনো ইট-পাথরের রাজপ্রাসাদ বা শুধুই দর্শনীয় স্থান নয়; এটি ঢাকাই ঐতিহ্যের মূল শেকড়কে ছুঁয়ে দেখার এক অপার জানালা। ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিকতা থেকে একটু মুক্তি পেয়ে এখানে এলে একই সাথে ইতিহাস, অনুপম স্থাপত্যকলা আর বুড়িগঙ্গার বাতাস—তিনটির অপূর্ব মেলবন্ধন উপভোগ করা যায়। পুরান ঢাকার কোলাহল পেরিয়ে যখনই এই গোলাপি প্রাসাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন, মনে হবে সময়ের ঘড়িটা উল্টো ঘুরেছে, আর আপনি নিজেই হারিয়ে গেছেন উনিশ শতকের কোনো এক সোনালী বিকেলে।