বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার সুরক্ষিত করে মূলত বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (পরবর্তীতে সংশোধনসহ)। অনেক কর্মীই অবগত নন যে চাকরি ছাড়ার সময়, ওভারটাইম করলে কিংবা হঠাৎ চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হলে আইন অনুযায়ী তাঁদের কী কী পাওনা থাকে। এই ফিচারে সহজ ভাষায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—গ্র্যাচুইটি, ওভারটাইম ভাতা এবং চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রভিত্তিক অধিকার ও পাওনা নিয়ে আলোচনা করা হলো।
গ্র্যাচুইটি: দীর্ঘদিনের সেবার স্বীকৃতি গ্র্যাচুইটি হলো দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার বিনিময়ে মালিকপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া একটি নির্দিষ্ট আর্থিক সুবিধা। এটি সাধারণত চাকরি শেষে (অবসর, পদত্যাগ, ছাঁটাই বা মৃত্যুতে) প্রদান করা হয়।
ছাঁটাই ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে: শ্রম আইনের ধারা ২০ অনুযায়ী, ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতি বছর চাকরির জন্য ৩০ দিনের মজুরি অথবা গ্র্যাচুইটি—যেটি বেশি—তা প্রদান করতে হবে। এছাড়া ধারা ১৯ অনুযায়ী, কোনো শ্রমিক দুই বছরের বেশি চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তাঁর মনোনীত ব্যক্তি বা উত্তরাধিকারী প্রতি পূর্ণ বছরের জন্য ৩০ দিনের মজুরি বা গ্র্যাচুইটি পাবেন। তবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে এই হার প্রতি বছরের জন্য ৪৫ দিনের মজুরি পর্যন্ত হতে পারে (যা অন্যান্য অবসরজনিত সুবিধার অতিরিক্ত হিসেবে প্রদেয়)।
পদত্যাগ ও ব্যতিক্রম: সাধারণ পদত্যাগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাকরির শর্তাবলী বা নীতিমালা অনুযায়ী এটি নির্ধারিত হয়, তবে ন্যূনতম মান হিসেবে আইনি হার প্রযোজ্য। মনে রাখা দরকার, গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত হলে শ্রমিক সাধারণত এই ক্ষতিপূরণ বা গ্র্যাচুইটি পান না।
ওভারটাইম: বাড়তি কাজের দ্বিগুণ প্রাপ্য শ্রম আইনের ধারা ১০০ ও ১০৮ অনুযায়ী, একজন শ্রমিকের স্বাভাবিক কর্মঘণ্টা দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে গড়ে ৪৮ ঘণ্টা। এর অতিরিক্ত সময় কাজ করানো হলে তা ওভারটাইম হিসেবে গণ্য হয়।
- ভাতার হার: নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজের জন্য শ্রমিককে তাঁর মূল মজুরির দ্বিগুণ হারে ওভারটাইম ভাতা দিতে হবে।
- সীমা ও অভিযোগ: আইন অনুযায়ী দৈনিক ও সাপ্তাহিক সর্বোচ্চ ওভারটাইম ঘণ্টার সীমা নির্দিষ্ট করা আছে। মালিকপক্ষ ওভারটাইম ভাতা পরিশোধ না করলে বা কম দিলে তা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। এই বঞ্চিত কর্মচারীরা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে অভিযোগ জানাতে পারেন।
চাকরিচ্যুত বা অবসান: চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া ও পাওনা নির্ভর করে এটি কোন ধরনের উপায়ে হচ্ছে—ছাঁটাই , অপসারণ, বরখাস্ত নাকি সাধারণ অবসান :
- ছাঁটাই: ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে আগে থেকে লিখিত নোটিশ প্রদান, প্রধান পরিদর্শক ও সিবিএ (যদি থাকে)-কে অবহিত করা এবং প্রতি বছরের চাকরির জন্য ৩০ দিনের মজুরি বা গ্র্যাচুইটি (যেটি বেশি) পরিশোধ করতে হয়।
- নোটিশ ছাড়া অবসান: নোটিশ ছাড়া বা তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি অবসান করা হলে, আইন অনুযায়ী নোটিশ মেয়াদের সমপরিমাণ বেতনের অর্থ শ্রমিককে পরিশোধ করতে হয় (যেমন: স্থায়ী শ্রমিকের ক্ষেত্রে সাধারণত ১২০ দিনের বা প্রতিষ্ঠানের ধরনভেদে নির্ধারিত সময়ের মজুরি)।
- তদন্ত ও শুনানি: কোনো গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে বরখাস্ত করতে হলেও প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই কারণ দর্শানোর নোটিশ, যথাযথ আইনি তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
আইনি অধিকার আদায়ের উপায় কোনো কর্মী যদি তাঁর আইনগত পাওনা থেকে বঞ্চিত হন, তবে তিনি প্রথমে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জানাবেন। সেখানে সমাধান না হলে নিকটস্থ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর -এ অভিযোগ করা যায়, কিংবা আইনগত সহায়তায় শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করা সম্ভব। এক্ষেত্রে নিজের নিয়োগপত্র, আইডি কার্ড, পে-স্লিপ, হাজিরার তথ্য ও ইমেইল সংক্রান্ত সকল নথি গুছিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
তথ্যসূত্র:
- বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত)
- কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE)
- বিডি লজ (আইন ও বিচার বিভাগ)
আইনবার্তা২৪ ডেস্ক 














