মিতু (ছদ্মনাম), কুমিল্লা থেকে লিখেছেন—
আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। বিয়ের সময় আমার পরিবার স্বামীর পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী কিছু আসবাব, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা দিয়েছিল। বিয়ের পর কিছুদিন সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও পরে আমার স্বামী আবার টাকা চাইতে শুরু করেন। কখনো বলেন, ব্যবসা করবেন, কখনো বলেন নতুন মোটরসাইকেল কিনবেন।
আমি বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতে না পারলে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমাকে বিভিন্নভাবে অপমান করেন। একপর্যায়ে আমাকে বলা হয়, “বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনতে না পারলে এই সংসারে তোমার জায়গা নেই।” সম্প্রতি আমার স্বামী আমাকে মারধরও করেছেন। আমি এখন বাবার বাড়িতে আছি।
আমার প্রশ্ন—
বিয়ের পর স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন টাকা চাইলে সেটি কি যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে? আমি কি তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি?
পরামর্শ: বাংলাদেশে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী যৌতুক দাবি করা, দেওয়া বা নেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
যৌতুক শুধু বিয়ের সময় চাওয়া অর্থ বা সম্পদেই সীমাবদ্ধ নয়। বিয়ের আগে, বিয়ের সময় কিংবা বৈবাহিক সম্পর্ক চলাকালীনও যৌতুক দাবি করা হলে তা আইনের আওতায় আসতে পারে।
অতএব, “বিয়ের সময় তো কিছু চাইনি, এখন ব্যবসার জন্য টাকা চাইছি”—এমন যুক্তি দিলেই বিষয়টি যৌতুকের আওতার বাইরে চলে যায় না। ঘটনার প্রকৃতি ও প্রমাণের ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে।
উপহার আর যৌতুক কি এক?
বিয়েতে আত্মীয়স্বজন বা পরিবার নিজেদের ইচ্ছায় কোনো উপহার দিলে সেটি স্বাভাবিকভাবে যৌতুক নয়।
কিন্তু—
বিয়ের শর্ত হিসেবে, অথবা বিয়ে টিকিয়ে রাখা কিংবা স্বামী-শ্বশুরবাড়ির দাবি পূরণের জন্য কোনো অর্থ, সম্পদ বা মূল্যবান সামগ্রী দিতে বাধ্য করা হলে বিষয়টি যৌতুকের পর্যায়ে পড়তে পারে।
অর্থাৎ স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার এবং দাবি করে আদায় করা যৌতুক—দুটি এক বিষয় নয়।
স্বামী টাকা চাইলে কী হবে?
স্বামী যদি নিজের প্রয়োজনের কথা বলে স্ত্রীর কাছে টাকা চান, শুধু টাকা চাওয়ার ঘটনাই সব ক্ষেত্রে যৌতুকের অপরাধ প্রমাণ করে না।
তবে যদি—
• বিয়ের কারণে টাকা বা সম্পদ দাবি করা হয়;
• শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য চাপ দেওয়া হয়;
• টাকা না দিলে নির্যাতন করা হয়;
• সংসার থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়;
• অথবা যৌতুকের দাবির সঙ্গে মারধর বা অন্য ধরনের নির্যাতন যুক্ত হয়,
তাহলে বিষয়টি গুরুতর আইনি অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারে।
যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন হলে?
যৌতুকের দাবির সঙ্গে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন যুক্ত হলে শুধু যৌতুক নিরোধ আইনের বিষয়ই নয়, ঘটনার ধরন অনুযায়ী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর সংশ্লিষ্ট বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে।
তাই কোনো নারী যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের শিকার হলে বিষয়টিকে “পারিবারিক ঝগড়া” বলে চুপ করে থাকা উচিত নয়।
কী ধরনের প্রমাণ রাখা জরুরি?
যৌতুকের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভব হলে সংরক্ষণ করুন—
#টাকা চাওয়ার মেসেজ বা চ্যাট
#টাকা বা সম্পদ দেওয়ার রসিদ বা ব্যাংক লেনদেনের তথ্য
# নির্যাতনের ছবি
#চিকিৎসার কাগজপত্র
# ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য
#আগে করা অভিযোগ বা সালিশের নথি
তবে প্রমাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না।
মিতুর ক্ষেত্রে করণীয়
মিতু যেহেতু বর্তমানে বাবার বাড়িতে রয়েছেন এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন, তাই প্রথমেই তাঁর নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এরপর তিনি—
1. ঘটনার বিস্তারিত লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে পারেন।
2. চিকিৎসা প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চিকিৎসার কাগজপত্র রাখতে পারেন।
3. টাকা দাবি বা হুমকির মেসেজ থাকলে সেগুলো সংরক্ষণ করতে পারেন।
4. প্রয়োজন অনুযায়ী থানায় অভিযোগ করতে পারেন।
5. পরিস্থিতি অনুযায়ী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।
6. একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন।
অনেক পরিবার মনে করে—
“বিয়ের পর মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখতে কিছু টাকা দিলে সমস্যা কী?”
এই মানসিকতাই অনেক সময় যৌতুকের দাবিকে উৎসাহিত করে। সংসার টিকিয়ে রাখার নামে বারবার টাকা দিতে থাকলে দাবি অনেক সময় কমে না; বরং বাড়তে পারে।
তাই যৌতুকের দাবি ও নির্যাতনের বিষয়কে শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অ্যডভোকেট ফাহমিদা সিদ্দিকা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। 














