ঢাকা ০৪:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo লালবাগ কেল্লা: ছুটির দিনে হারিয়ে যান মুঘল ইতিহাসের অসমাপ্ত দুর্গে Logo দুর্নীতিমুক্ত আদালত গঠনে প্রধান বিচারপতিকে এক মাসের আল্টিমেটাম Logo ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের নির্দেশ হাইকোর্টের Logo রিট খারিজ, ছবি ছাড়া করা যাবে না জাতীয় পরিচয়পত্র Logo যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ড: আবুল কালাম আযাদের আপিল শুনানি ৪ সপ্তাহ মুলতবি Logo ব্যবসায়ীদের মতামত নিয়েই কোম্পানি আইন সংশোধন: বাণিজ্যমন্ত্রী Logo বাংলাভাষী মুসলিম নারীকে বাংলাদেশে পুশব্যাক:আসাম সরকারকে ২ লাখ রুপি জরিমানা Logo পাস হলো মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিকার বিল Logo সন্তানকে দানের পরও সম্পত্তিতে বাবা-মায়ের ভোগাধিকার, আইন পাস Logo বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি: সফলতার পূর্ণাঙ্গ ও ব্যবহারিক নির্দেশিকা

সালমান শাহর মৃত্যু: তিন দশকের আইনি পথচলা

নব্বইয়ের দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রে এক নতুন তারকার আবির্ভাব ঘটেছিল। অভিনয়, পোশাক, চুলের স্টাইল ও পর্দায় উপস্থিতি—সবকিছুতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন তরুণদের আইকন। তিনি সালমান শাহ; প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন।

মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়া এই অভিনেতার জীবন থেমে যায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকার নিউ ইস্কাটনের বাসায় তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর শুরু হয় একটি অপমৃত্যুর মামলা।

কিন্তু সেই মামলা সেখানেই থেমে থাকেনি।

প্রথমে তদন্তে আসে আত্মহত্যার তত্ত্ব। পরে বিচার বিভাগীয় তদন্তেও হত্যার অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি। এরপর র‌্যাব ও পিবিআই তদন্ত করে। পিবিআইও মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো হয়।

অবশেষে ২০২৫ সালে, মৃত্যুর প্রায় ২৯ বছর পর, আদালতের নির্দেশে ঘটনাটি নতুন করে হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়। ২০২৬ সালে মামলায় আসে আরও নাটকীয় মোড়—এজাহারভুক্ত আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন গ্রেপ্তার হন এবং রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে ১২ লাখ টাকার কথিত চুক্তির দাবি তোলে।

এক নজরে সালমান শাহ মামলা

মৃত্যু: ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬
প্রথম মামলা: অপমৃত্যু মামলা
প্রথম তদন্ত: সিআইডি
প্রথম সিদ্ধান্ত: আত্মহত্যা
বিচার বিভাগীয় তদন্ত: ২০০৩–২০১৪
পিবিআই তদন্ত: ২০১৬–২০২০
পিবিআইয়ের সিদ্ধান্ত: হত্যার প্রমাণ নেই, আত্মহত্যা
হত্যা মামলা: ২০/২১ অক্টোবর ২০২৫
আসামি: ১১ জন
ডন গ্রেপ্তার: ৯ আগস্ট ২০২৬
বর্তমান তদন্তকারী সংস্থা: সিআইডি
তদন্ত প্রতিবেদন জমার নতুন তারিখ: ৩০ আগস্ট ২০২৬

সেপ্টেম্বর ১৯৯৬: যে সকালে থেমে গেল সালমান শাহর জীবন

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার নিউ ইস্কাটন গার্ডেন এলাকার বাসায় সালমান শাহকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫ বছর।

ঘটনার পর তাঁর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রমনা থানায় অপমৃত্যু মামলা করেন।

তবে শুরু থেকেই সালমানের পরিবারের একাংশের দাবি ছিল—এটি আত্মহত্যা নয়, তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

এখান থেকেই শুরু হয় প্রায় তিন দশকের আইনি লড়াই।

১৯৯৭: সিআইডির তদন্তে ‘আত্মহত্যা’

ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডি।

৩ নভেম্বর ১৯৯৭ সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি সালমান শাহর পরিবার।

তাঁর বাবা সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন আবেদন করেন। ফলে মামলাটি আবারও আদালতের সামনে ফিরে আসে।

২০০৩–২০১৪: ১১ বছর ধরে বিচার বিভাগীয় তদন্ত

দীর্ঘ শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়ার পর ১৯ মে ২০০৩ আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এরপর চলে দীর্ঘ তদন্ত।

প্রায় ১১ বছর পর আগস্ট ২০১৪ বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। সেই প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং ঘটনাটিকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু তাতেও রহস্যের অবসান হয়নি।

এর মধ্যে সালমান শাহর বাবা মারা গেলে মামলার আইনি লড়াই চালিয়ে যান তাঁর মা নীলা চৌধুরী।

২০১৫: মায়ের নারাজি, ১১ জনকে সন্দেহ

১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ নীলা চৌধুরী বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন।

তিনি তাঁর ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে দাবি করেন এবং কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ তুলে ধরেন।

এরপর মামলাটি নতুন তদন্তের দিকে যায়।

প্রথমে তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের রিভিশনের পর ২১ আগস্ট ২০১৬ আদালত র‌্যাবকে তদন্ত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এরপর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআইকে।

২০২০: ৬০০ পৃষ্ঠার পিবিআই প্রতিবেদন

প্রায় চার বছর তদন্তের পর ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ পিবিআই ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়। প্রতিবেদনে ৫৪ জন সাক্ষীর বক্তব্য ও বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণের কথা বলা হয়।

পিবিআইয়ের সিদ্ধান্ত ছিল—সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তদন্তে দাম্পত্য কলহ, অভিনেত্রী শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক টানাপোড়েন এবং মানসিক যন্ত্রণার বিষয়গুলো উঠে আসে; পিবিআইয়ের মতে, এসবের প্রেক্ষাপটে সালমান আত্মহত্যা করেছিলেন।

২০২১: আবারও মামলা নিষ্পত্তির পথে

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধেও নারাজি জানান নীলা চৌধুরী।

তবে ৩১ অক্টোবর ২০২১ আদালত পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন এবং মামলাটি নিষ্পত্তির আদেশ দেন।

বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছিল, প্রায় ২৫ বছর ধরে চলা মামলাটির এখানেই শেষ।

কিন্তু সেটিই শেষ ছিল না।

২০২২: আবার আদালতে ফিরে যায় সালমান শাহ মামলা

২০২১ সালের আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ১২ জুন রিভিশন মামলা করা হয়। এরপর আরও কয়েক বছর আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত মামলাটিকে নিয়ে যায় ২০২৫ সালের ঐতিহাসিক মোড়ে।

২০ অক্টোবর ২০২৫: অপমৃত্যু থেকে ‘হত্যা মামলা’

প্রায় ২৯ বছর পর আসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।

২০ অক্টোবর ২০২৫ ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক নীলা চৌধুরীর করা রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন এবং সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যা মামলা হিসেবে এজাহার গ্রহণের নির্দেশ দেন।

এই আদেশের পর আর এটি শুধু পুরোনো অপমৃত্যু মামলা থাকেনি।

২১ অক্টোবর ২০২৫ রমনা থানায় সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

মামলার ১১ আসামি

১. সামিরা হক—সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী
২. লতিফা হক লুসি—সামিরার মা
৩. আজিজ মোহাম্মদ ভাই—ব্যবসায়ী ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক
৪. আশরাফুল হক ওরফে ডন—অভিনেতা
৫. ডেভিড
৬. জাভেদ
৭. ফারুক
৮. রুবি
৯. এ সাত্তার
১০. সাজু
১১. রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ

তবে মামলায় আসামি হওয়া মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযোগ প্রমাণিত হতে হবে।

২০২৬: তদন্তে একের পর এক নতুন মোড়

১৩ জানুয়ারি ২০২৬ মামলার ১১ আসামির সম্পদ জব্দের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। মামলাটি তখনও তদন্তাধীন ছিল।

মে: দেহাবশেষ উত্তোলনের আবেদন

২০ মে ২০২৬ তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ সালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন করে নতুন করে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের অনুমতি চান।

এরপর ২৪ মে আদালত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দেহাবশেষ উত্তোলন ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন।

তবে পরে বাদীপক্ষ ওই আদেশ বাতিলের আবেদন করে। জুনে এ নিয়ে আদালতে নতুন জটিলতা তৈরি হয়। একই সময়ে দেহাবশেষ উত্তোলন কার্যক্রম তদারকির জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের খবরও প্রকাশিত হয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া জটিল হয়ে ওঠে।

৯ আগস্ট ২০২৬: গ্রেপ্তার হলেন অভিনেতা ডন

মামলার তদন্তে সবচেয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে আগস্টে।

৯ আগস্ট ২০২৬ ভোরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলায় তিনি ৪ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি। তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইমিগ্রেশন থেকে তাঁকে আটক করে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এটি ছিল ২০২৫ সালে হত্যা মামলা হওয়ার পর মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যমান অগ্রগতি।

১২ লাখ টাকার ‘চুক্তি’: আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের চাঞ্চল্যকর দাবি

ডনকে আদালতে হাজির করার পর মামলায় আসে নতুন বিস্ফোরক দাবি।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে দাবি করেন, সালমান শাহকে হত্যার জন্য ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এই তথ্য অন্য একটি মামলায় আসামি রিজভী আহমেদের দেওয়া জবানবন্দির সূত্রে সামনে এসেছে।

তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:

১২ লাখ টাকার চুক্তির বিষয়টি এখনো আদালতে প্রমাণিত ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রপক্ষের উত্থাপিত অভিযোগ/দাবি।

মামলার তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে এই দাবির সত্যতা।

একই শুনানিতে ডনের জামিন আবেদনও নামঞ্জুর হয়।

এখন কোথায় দাঁড়িয়ে সালমান শাহ মামলা?

প্রায় ৩০ বছর পর মামলাটি এখন সম্পূর্ণ নতুন আইনি পর্যায়ে।

আগের তিন দফা তদন্ত—সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও পিবিআই—মূলত সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের আদালতের নির্দেশের পর এবার ঘটনাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে তদন্ত হচ্ছে।

বর্তমানে তদন্ত করছে সিআইডি

সর্বশেষ ২৩ জুলাই ২০২৬ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দাখিল করা সম্ভব হয়নি। আদালত নতুন করে ৩০ আগস্ট ২০২৬ প্রতিবেদন জমার তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

অর্থাৎ, ১৫ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি।

তাহলে কি তিন দশকের রহস্যের সমাধান হতে যাচ্ছে?

এখনই সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় অতীতে একাধিক তদন্ত হয়েছে এবং সেগুলোতে হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এবার আদালতের নির্দেশে নতুন করে হত্যা মামলা তদন্ত করছে সিআইডি।

অন্যদিকে, ডন গ্রেপ্তার এবং রাষ্ট্রপক্ষের ১২ লাখ টাকার চুক্তির দাবি মামলাটিকে নতুন করে জনআলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। কিন্তু অভিযোগ, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং আদালতে প্রমাণিত সত্যএই তিনটি এক বিষয় নয়।

তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন।

৩০ আগস্ট ২০২৬ নির্ধারিত তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে কি না, প্রতিবেদনে কী তথ্য উঠে আসে এবং আদালত পরবর্তী সময়ে কী সিদ্ধান্ত দেন—তার ওপরই নির্ভর করবে সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য নতুন কোনো দিকে মোড় নেয় কি না।

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

লালবাগ কেল্লা: ছুটির দিনে হারিয়ে যান মুঘল ইতিহাসের অসমাপ্ত দুর্গে

সালমান শাহর মৃত্যু: তিন দশকের আইনি পথচলা

আপডেট সময় ০৭:২৫:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

নব্বইয়ের দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রে এক নতুন তারকার আবির্ভাব ঘটেছিল। অভিনয়, পোশাক, চুলের স্টাইল ও পর্দায় উপস্থিতি—সবকিছুতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন তরুণদের আইকন। তিনি সালমান শাহ; প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন।

মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়া এই অভিনেতার জীবন থেমে যায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকার নিউ ইস্কাটনের বাসায় তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর শুরু হয় একটি অপমৃত্যুর মামলা।

কিন্তু সেই মামলা সেখানেই থেমে থাকেনি।

প্রথমে তদন্তে আসে আত্মহত্যার তত্ত্ব। পরে বিচার বিভাগীয় তদন্তেও হত্যার অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি। এরপর র‌্যাব ও পিবিআই তদন্ত করে। পিবিআইও মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো হয়।

অবশেষে ২০২৫ সালে, মৃত্যুর প্রায় ২৯ বছর পর, আদালতের নির্দেশে ঘটনাটি নতুন করে হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়। ২০২৬ সালে মামলায় আসে আরও নাটকীয় মোড়—এজাহারভুক্ত আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন গ্রেপ্তার হন এবং রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে ১২ লাখ টাকার কথিত চুক্তির দাবি তোলে।

এক নজরে সালমান শাহ মামলা

মৃত্যু: ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬
প্রথম মামলা: অপমৃত্যু মামলা
প্রথম তদন্ত: সিআইডি
প্রথম সিদ্ধান্ত: আত্মহত্যা
বিচার বিভাগীয় তদন্ত: ২০০৩–২০১৪
পিবিআই তদন্ত: ২০১৬–২০২০
পিবিআইয়ের সিদ্ধান্ত: হত্যার প্রমাণ নেই, আত্মহত্যা
হত্যা মামলা: ২০/২১ অক্টোবর ২০২৫
আসামি: ১১ জন
ডন গ্রেপ্তার: ৯ আগস্ট ২০২৬
বর্তমান তদন্তকারী সংস্থা: সিআইডি
তদন্ত প্রতিবেদন জমার নতুন তারিখ: ৩০ আগস্ট ২০২৬

সেপ্টেম্বর ১৯৯৬: যে সকালে থেমে গেল সালমান শাহর জীবন

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার নিউ ইস্কাটন গার্ডেন এলাকার বাসায় সালমান শাহকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫ বছর।

ঘটনার পর তাঁর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রমনা থানায় অপমৃত্যু মামলা করেন।

তবে শুরু থেকেই সালমানের পরিবারের একাংশের দাবি ছিল—এটি আত্মহত্যা নয়, তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

এখান থেকেই শুরু হয় প্রায় তিন দশকের আইনি লড়াই।

১৯৯৭: সিআইডির তদন্তে ‘আত্মহত্যা’

ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডি।

৩ নভেম্বর ১৯৯৭ সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি সালমান শাহর পরিবার।

তাঁর বাবা সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন আবেদন করেন। ফলে মামলাটি আবারও আদালতের সামনে ফিরে আসে।

২০০৩–২০১৪: ১১ বছর ধরে বিচার বিভাগীয় তদন্ত

দীর্ঘ শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়ার পর ১৯ মে ২০০৩ আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এরপর চলে দীর্ঘ তদন্ত।

প্রায় ১১ বছর পর আগস্ট ২০১৪ বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। সেই প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং ঘটনাটিকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু তাতেও রহস্যের অবসান হয়নি।

এর মধ্যে সালমান শাহর বাবা মারা গেলে মামলার আইনি লড়াই চালিয়ে যান তাঁর মা নীলা চৌধুরী।

২০১৫: মায়ের নারাজি, ১১ জনকে সন্দেহ

১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ নীলা চৌধুরী বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন।

তিনি তাঁর ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে দাবি করেন এবং কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ তুলে ধরেন।

এরপর মামলাটি নতুন তদন্তের দিকে যায়।

প্রথমে তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের রিভিশনের পর ২১ আগস্ট ২০১৬ আদালত র‌্যাবকে তদন্ত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এরপর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআইকে।

২০২০: ৬০০ পৃষ্ঠার পিবিআই প্রতিবেদন

প্রায় চার বছর তদন্তের পর ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ পিবিআই ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়। প্রতিবেদনে ৫৪ জন সাক্ষীর বক্তব্য ও বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণের কথা বলা হয়।

পিবিআইয়ের সিদ্ধান্ত ছিল—সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তদন্তে দাম্পত্য কলহ, অভিনেত্রী শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক টানাপোড়েন এবং মানসিক যন্ত্রণার বিষয়গুলো উঠে আসে; পিবিআইয়ের মতে, এসবের প্রেক্ষাপটে সালমান আত্মহত্যা করেছিলেন।

২০২১: আবারও মামলা নিষ্পত্তির পথে

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধেও নারাজি জানান নীলা চৌধুরী।

তবে ৩১ অক্টোবর ২০২১ আদালত পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন এবং মামলাটি নিষ্পত্তির আদেশ দেন।

বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছিল, প্রায় ২৫ বছর ধরে চলা মামলাটির এখানেই শেষ।

কিন্তু সেটিই শেষ ছিল না।

২০২২: আবার আদালতে ফিরে যায় সালমান শাহ মামলা

২০২১ সালের আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ১২ জুন রিভিশন মামলা করা হয়। এরপর আরও কয়েক বছর আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত মামলাটিকে নিয়ে যায় ২০২৫ সালের ঐতিহাসিক মোড়ে।

২০ অক্টোবর ২০২৫: অপমৃত্যু থেকে ‘হত্যা মামলা’

প্রায় ২৯ বছর পর আসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।

২০ অক্টোবর ২০২৫ ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক নীলা চৌধুরীর করা রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন এবং সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যা মামলা হিসেবে এজাহার গ্রহণের নির্দেশ দেন।

এই আদেশের পর আর এটি শুধু পুরোনো অপমৃত্যু মামলা থাকেনি।

২১ অক্টোবর ২০২৫ রমনা থানায় সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

মামলার ১১ আসামি

১. সামিরা হক—সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী
২. লতিফা হক লুসি—সামিরার মা
৩. আজিজ মোহাম্মদ ভাই—ব্যবসায়ী ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক
৪. আশরাফুল হক ওরফে ডন—অভিনেতা
৫. ডেভিড
৬. জাভেদ
৭. ফারুক
৮. রুবি
৯. এ সাত্তার
১০. সাজু
১১. রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ

তবে মামলায় আসামি হওয়া মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযোগ প্রমাণিত হতে হবে।

২০২৬: তদন্তে একের পর এক নতুন মোড়

১৩ জানুয়ারি ২০২৬ মামলার ১১ আসামির সম্পদ জব্দের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। মামলাটি তখনও তদন্তাধীন ছিল।

মে: দেহাবশেষ উত্তোলনের আবেদন

২০ মে ২০২৬ তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ সালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন করে নতুন করে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের অনুমতি চান।

এরপর ২৪ মে আদালত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দেহাবশেষ উত্তোলন ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন।

তবে পরে বাদীপক্ষ ওই আদেশ বাতিলের আবেদন করে। জুনে এ নিয়ে আদালতে নতুন জটিলতা তৈরি হয়। একই সময়ে দেহাবশেষ উত্তোলন কার্যক্রম তদারকির জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের খবরও প্রকাশিত হয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া জটিল হয়ে ওঠে।

৯ আগস্ট ২০২৬: গ্রেপ্তার হলেন অভিনেতা ডন

মামলার তদন্তে সবচেয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে আগস্টে।

৯ আগস্ট ২০২৬ ভোরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলায় তিনি ৪ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি। তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইমিগ্রেশন থেকে তাঁকে আটক করে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এটি ছিল ২০২৫ সালে হত্যা মামলা হওয়ার পর মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যমান অগ্রগতি।

১২ লাখ টাকার ‘চুক্তি’: আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের চাঞ্চল্যকর দাবি

ডনকে আদালতে হাজির করার পর মামলায় আসে নতুন বিস্ফোরক দাবি।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে দাবি করেন, সালমান শাহকে হত্যার জন্য ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এই তথ্য অন্য একটি মামলায় আসামি রিজভী আহমেদের দেওয়া জবানবন্দির সূত্রে সামনে এসেছে।

তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:

১২ লাখ টাকার চুক্তির বিষয়টি এখনো আদালতে প্রমাণিত ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রপক্ষের উত্থাপিত অভিযোগ/দাবি।

মামলার তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে এই দাবির সত্যতা।

একই শুনানিতে ডনের জামিন আবেদনও নামঞ্জুর হয়।

এখন কোথায় দাঁড়িয়ে সালমান শাহ মামলা?

প্রায় ৩০ বছর পর মামলাটি এখন সম্পূর্ণ নতুন আইনি পর্যায়ে।

আগের তিন দফা তদন্ত—সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও পিবিআই—মূলত সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের আদালতের নির্দেশের পর এবার ঘটনাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে তদন্ত হচ্ছে।

বর্তমানে তদন্ত করছে সিআইডি

সর্বশেষ ২৩ জুলাই ২০২৬ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দাখিল করা সম্ভব হয়নি। আদালত নতুন করে ৩০ আগস্ট ২০২৬ প্রতিবেদন জমার তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

অর্থাৎ, ১৫ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি।

তাহলে কি তিন দশকের রহস্যের সমাধান হতে যাচ্ছে?

এখনই সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় অতীতে একাধিক তদন্ত হয়েছে এবং সেগুলোতে হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এবার আদালতের নির্দেশে নতুন করে হত্যা মামলা তদন্ত করছে সিআইডি।

অন্যদিকে, ডন গ্রেপ্তার এবং রাষ্ট্রপক্ষের ১২ লাখ টাকার চুক্তির দাবি মামলাটিকে নতুন করে জনআলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। কিন্তু অভিযোগ, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং আদালতে প্রমাণিত সত্যএই তিনটি এক বিষয় নয়।

তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন।

৩০ আগস্ট ২০২৬ নির্ধারিত তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে কি না, প্রতিবেদনে কী তথ্য উঠে আসে এবং আদালত পরবর্তী সময়ে কী সিদ্ধান্ত দেন—তার ওপরই নির্ভর করবে সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য নতুন কোনো দিকে মোড় নেয় কি না।