ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর হত্যা মামলায় নতুন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ও অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে হাজির করা হলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দাবি করেছেন, সালমান শাহকে হত্যার জন্য ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তির তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি অনুযায়ী, সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক ও ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের কথিত সম্পর্কের জের ধরে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে ১২ লাখ টাকার চুক্তি নিয়ে মামলার নথিতে থাকা রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দির বর্ণনায় ভিন্ন তথ্যও রয়েছে। সেখানে সালমানকে হত্যার জন্য তাঁর শাশুড়ি লতিফা হক লুসির পক্ষ থেকে চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এই অভিযোগের প্রকৃত ভূমিকা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।
বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার ডন
রোববার ভোরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন এলাকা থেকে আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। সিআইডি তাঁকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে। শুনানি শেষে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনে নিজ বাসায় সালমান শাহর মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে তদন্তের পর ২০২৫ সালে আদালতের নির্দেশে বিষয়টি হত্যা মামলা হিসেবে পুনরায় তদন্তের পথে যায়। বর্তমানে সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।
১২ লাখ টাকার চুক্তির তথ্য কোথা থেকে?
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকীর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে সালমান শাহকে হত্যার জন্য ১২ লাখ টাকার চুক্তির তথ্য পাওয়া গেছে। এ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি থেকে।
প্রকাশিত নথি ও আগের প্রতিবেদনগুলোতে রিজভীর জবানবন্দির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সালমানকে হত্যার জন্য ১২ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং এ পরিকল্পনায় ডন, ডেভিড, ফারুক ও জাভেদের নাম উঠে আসে। ওই জবানবন্দিতে চুক্তির সঙ্গে লতিফা হক লুসির সম্পৃক্ততার কথাও বলা হয়েছিল।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সামিরা হক ও আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের কথিত সম্পর্ক এবং তাঁদের ভূমিকার বিষয়টি সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
সালমানের ভাইকে অপহরণের পরিকল্পনার অভিযোগ
রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু হত্যার পরিকল্পনাই নয়, মামলা তুলে নিতে চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে সালমান শাহর ভাই বিল্টুকে অপহরণের পরিকল্পনার অভিযোগও রয়েছে ডন ও ডেভিডের বিরুদ্ধে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় ১৯৯৭ সালের ১৯ জুলাই রিজভী আহমেদ গ্রেপ্তার হন। পরে একই বছরের ২৪ জুলাই তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। সেই জবানবন্দিই পরবর্তী সময়ে সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উঠে আসে।
আত্মহত্যা নাকি হত্যা—ফের বিচারের মুখে পুরোনো রহস্য
সালমান শাহর মৃত্যুর পর প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ তোলা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশে সালমানের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের পথ তৈরি হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আদালত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সময়ও নির্ধারণ করেন।
এখন তদন্তের মূল প্রশ্নগুলোর মধ্যে রয়েছে—সালমান শাহর মৃত্যু কীভাবে ঘটেছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন, হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল কি না এবং ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে উঠে আসা তথ্যগুলোর সঙ্গে অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের কতটা মিল রয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে বিচার
সালমান শাহ হত্যা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত নয়। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষীদের জবানবন্দি বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাই হবে। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রত্যেক আসামির ভূমিকা ও দায় নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
প্রায় তিন দশক ধরে আলোচিত এই মামলায় নতুন করে গ্রেপ্তার, ১২ লাখ টাকার কথিত চুক্তি এবং পুরোনো জবানবন্দির বিষয় সামনে আসায় সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য আবারও জনআলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। এখন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকেই তাকিয়ে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্যের উত্তর।
আদালত প্রতিবেদক 














