নতুন বাসা পেয়েছেন। পছন্দও হয়েছে। বাড়িওয়ালাকে দুই বা তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া দিয়ে নিশ্চিন্তে উঠে গেলেন। কিন্তু কয়েক মাস পর বাসা ছাড়ার সময় হঠাৎ শুরু হলো নানামুখী জটিলতা—অগ্রিম টাকা ফেরত দেওয়া হবে কি হবে না, দেওয়ালে সামান্য দাগের জন্য কত টাকা কাটা হবে, বকেয়া বিদ্যুৎ বিল কে দেবে, কিংবা নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না—এমন হাজারো প্রশ্ন।
বাংলাদেশে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যকার অধিকাংশ বিরোধের মূল কারণ একটিই—লিখিত চুক্তির অভাব অথবা অসম্পূর্ণ চুক্তিপত্র।
অনেকেই মনে করেন, পরিচিত মানুষ বা আত্মীয়ের বাসা হলে লিখিত চুক্তির কী দরকার! কিন্তু বাস্তবতা হলো, সম্পর্ক যত ভালোই হোক, অর্থের বিষয় এলে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতেই পারে। আর তখন মুখের কথার কোনো আইনি মূল্য থাকে না; লিখিত চুক্তিই হয় সবচেয়ে বড় ঢাল।
তাই নতুন বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে জেনে নিন—১৯৯১ সালের বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কী বলে, একটি ভাড়ার চুক্তিপত্রে কী কী শর্ত থাকা বাধ্যতামূলক এবং আইন আপনাকে কী ধরনের সুরক্ষা দেয়।
চুক্তিপত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভাড়ার চুক্তিপত্র হলো বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে সম্পাদিত একটি লিখিত আইনি দলিল, যেখানে উভয় পক্ষের অধিকার, দায়িত্ব ও শর্তাবলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে।
মৌখিক চুক্তির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—সময়ের সঙ্গে দুই পক্ষের বক্তব্য বদলে যেতে পারে। আদালত বা যেকোনো সালিশি ব্যবস্থার কাছে মুখের কথার চেয়ে লিখিত দলিলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। সাধারণত নির্ধারিত মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে এই চুক্তি সম্পাদন করতে হয় এবং নোটারি পাবলিক বা প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা সত্যায়িত করিয়ে নিলে এর আইনি শক্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
একটি আদর্শ চুক্তিপত্রে নিচের বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে থাকা আবশ্যক:
• উভয় পক্ষের নাম, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এবং সচল মোবাইল নম্বর।
• ফ্ল্যাট নম্বর, তলা, কক্ষসংখ্যা, গ্যারেজ সুবিধা এবং সুনির্দিষ্ট ঠিকানা।
• মাসিক ভাড়া কত, প্রতি মাসের কত তারিখের মধ্যে দিতে হবে এবং মাধ্যমটি কী (নগদ, ব্যাংক ট্রান্সফার নাকি মোবাইল ব্যাংকিং) তা স্পষ্ট করুন।
• বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ইন্টারনেট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সোসাইটি/সার্ভিস চার্জ কে পরিশোধ করবেন, তা পরিষ্কারভাবে লিখুন।
• কাঠামোগত বা বড় ধরনের মেরামত (যেমন: ছাদ চুয়ে পানি পড়া, পাইপলাইন ফেটে যাওয়া) বাড়িওয়ালার দায়িত্ব। আর দৈনন্দিন ব্যবহারজনিত ছোটখাটো মেরামত ভাড়াটিয়ার দায়িত্ব—এটি চুক্তিতে উল্লেখ থাকা ভালো।
• ভাড়াটিয়া অন্য কাউকে সাবলেট দিতে পারবেন কি না এবং বাসা ছাড়ার বা ছাড়ানোর কত দিন আগে (সাধারণত ১ থেকে ২ মাস) লিখিত নোটিশ দিতে হবে, তা উল্লেখ থাকতে হবে।
অগ্রিম টাকা ও জামানত: আইনে কী বলা আছে?
বাসা ভাড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বিরোধ হয় ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট’ বা অগ্রিম টাকা ফেরত নিয়ে। এই বিষয়ে ১৯৯১ সালের বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ১০ ধারা অত্যন্ত স্পষ্ট।
আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী, ভাড়া দেওয়া, নবায়ন করা বা মেয়াদ বাড়ানোর কারণে কেউ ভাড়ার অতিরিক্ত কোনো প্রিমিয়াম, সালামী, জামানত বা অনুরূপ অর্থ দাবি করতে পারবেন না। আর ভাড়া নিয়ন্ত্রকের পূর্বানুমোদন ছাড়া অগ্রিম ভাড়া হিসেবে এক মাসের ভাড়ার বেশি টাকা দাবি বা গ্রহণ করা যাবে না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ২০২৬ সালে জারি করা একটি প্রশাসনিক নির্দেশিকায় ঢাকা মহানগরীর জন্য অগ্রিম ভাড়ার সীমা ১ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। এটি মূল আইনের ১ মাসের সীমার চেয়ে বেশি নমনীয়—তবে এটি একটি স্থানীয় প্রশাসনিক নির্দেশনা, মূল ১৯৯১ সালের আইনের সংশোধনী নয়। তাই এলাকাভেদে কার্যকর নিয়ম যাচাই করে নেওয়া ভালো।
চুক্তিপত্রে অগ্রিম টাকার অংশটি লেখার সময় নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করুন:
• কত টাকা জামানত দেওয়া হলো এবং সেটি কোন তারিখে দেওয়া হয়েছে।
• “বাসা বুঝিয়ে দেওয়ার সর্বোচ্চ ৭ কার্যদিবসের মধ্যে জামানতের টাকা ফেরত দেওয়া হবে”—এমন সুনির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করুন।
• বকেয়া ভাড়া বা ইউটিলিটি বিল এবং ভাড়াটিয়ার কারণে সম্পত্তির কোনো প্রত্যক্ষ ক্ষতি হলে তা অগ্রিম থেকে কাটা যাবে; তবে সাধারণ ব্যবহারজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য টাকা কাটা যাবে না—এটি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে লিখে দেওয়া উচিত।
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী আপনার অধিকার
আমাদের দেশের প্রচলিত আইন কেবল বাড়িওয়ালা বা কেবল ভাড়াটিয়ার পক্ষ নেয় না, বরং উভয়ের অধিকারেরই সুরক্ষা দেয়।
ভাড়াটিয়ার আইনি অধিকার
ভাড়ার রসিদ পাওয়ার অধিকার (ধারা ১৩): ভাড়া দেওয়ার সাথে সাথেই বাড়িওয়ালা কাউন্টার পার্টসহ (মুড়ি বই) ভাড়ার রসিদ দিতে বাধ্য। আইনের ২৭ ধারা অনুযায়ী, বাড়িওয়ালা রসিদ দিতে অস্বীকার করলে বা ব্যর্থ হলে আদায়কৃত টাকার দ্বিগুণ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ (ধারা ৭, ১৫ ও ১৬): মানসম্মত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া বৃদ্ধি করা হলে, চুক্তিতে ভিন্ন কিছু লেখা থাকলেও, সেই বাড়তি অংশ আদায়যোগ্য নয় (ধারা ৭)। মানসম্মত ভাড়া নির্ধারিত হয় বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশ হিসেবে (ধারা ১৫), এবং তা প্রতি দুই বছর পরপর নিয়ন্ত্রক কর্তৃক পুনর্নির্ধারণযোগ্য (ধারা ১৬)। অর্থাৎ বাড়িওয়ালা চাইলেই যেকোনো সময় ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াতে পারেন না।
উচ্ছেদ প্রতিরোধ (ধারা ১৮): ভাড়াটিয়া যদি নিয়মিত ও পূর্ণ ভাড়া পরিশোধ করেন এবং চুক্তির শর্ত ভঙ্গ না করেন, তবে বাড়িওয়ালা তাকে জোরপূর্বক বা আকস্মিকভাবে উচ্ছেদ করতে পারবেন না।
বিদ্যুৎ সংযোগের অধিকার (ধারা ৩২): বাড়িওয়ালা অনুমতি না দিলেও ভাড়াটিয়া লাইসেন্সধারী বিদ্যুৎ সরবরাহকারীর কাছ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার অধিকারী। অর্থাৎ বাড়িওয়ালা একতরফাভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ আটকে রাখতে পারেন না।
বাড়িওয়ালার আইনি অধিকার
সময়মতো ভাড়া পাওয়া: চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভাড়া পাওয়ার পূর্ণ অধিকার বাড়িওয়ালার রয়েছে।
সম্পত্তি পরিদর্শন: যুক্তিসঙ্গত কারণে এবং যথাযথ পূর্ব-নোটিশ দিয়ে বাড়িওয়ালা বাসা পরিদর্শন করতে পারেন।
উচ্ছেদের অধিকার (নির্দিষ্ট কারণে, ধারা ১৮): ভাড়াটিয়া চুক্তিতে বা আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ না করলে, লিখিত সম্মতি ছাড়া সাবলেট দিলে, প্রতিবেশীর জন্য উপদ্রব তৈরি করলে, বাসার অংশ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে, বা বাড়ি পুনর্নির্মাণ/নিজ দখলের প্রকৃত প্রয়োজন হলে—বাড়িওয়ালা আদালতের মাধ্যমে উচ্ছেদের আদেশ নিতে পারেন।
যে ৫টি ভুল কখনোই করবেন না
• লিখিত চুক্তি ছাড়া কেবল মুখের কথায় বা বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে বাসায় উঠবেন না।
• রসিদ বা লিখিত প্রমাণ ছাড়া অগ্রিম বা ভাড়ার টাকা লেনদেন করবেন না।
• চুক্তিপত্র না পড়ে কোনো দলিলে স্বাক্ষর করবেন না। প্রতিটি শর্ত ভালো করে বুঝে নিন।
• মূল চুক্তির কপি বাড়িওয়ালার কাছে রেখে নিজে খালি হাতে ফিরবেন না। সর্বদা মূল কপির একটি সেট নিজের কাছে রাখুন।
• অস্পষ্ট কোনো শর্ত (যেমন: “ভবিষ্যতে আলোচনা সাপেক্ষে ভাড়া বাড়বে”) চুক্তিতে রাখবেন না। যা লিখবেন সুনির্দিষ্ট করে লিখবেন।
বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে এই ৭টি বিষয় নিশ্চিত করুন
1. বাড়িওয়ালার সাথে স্বাক্ষরিত মূল ভাড়ার চুক্তিপত্র।
2. বাড়িওয়ালার জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) কপি এবং টিন সার্টিফিকেট (যদি থাকে)।
3. অগ্রিম বা সিকিউরিটি ডিপোজিট প্রদানের স্বাক্ষরিত রসিদ।
4. বাসার সর্বশেষ মাসের পরিশোধিত ইউটিলিটি বিলের (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি) কপি (যাতে পূর্বের কোনো বকেয়া আপনার ঘাড়ে না চাপে)।
5. প্রতি মাসে ভাড়া পরিশোধের পর ভাড়ার রসিদ বা মানি রসিদ বুঝে নেওয়া।
6. বহুতল ভবন বা সোসাইটি হলে তাদের নিজস্ব নিয়মাবলী ও নির্দেশিকা।
7. চুক্তির প্রতিটি পৃষ্ঠায় বাড়িওয়ালা, ভাড়াটিয়া এবং সাক্ষীদের স্বাক্ষর।
বাসা ভাড়া নেওয়াকে দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ একটি ঘটনা মনে হলেও, অসচেতনতার কারণে এখান থেকেই বড় ধরনের আইনি ও আর্থিক বিরোধের সূত্রপাত হয়। মাত্র কয়েক পৃষ্ঠার একটি আইনি চুক্তিপত্র আপনাকে দীর্ঘদিনের মানসিক হয়রানি, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং আদালতের চক্কর থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই নতুন বাসা পছন্দ করার পর তাড়াহুড়ো না করে, আইনের ধারাগুলো মেনে একটি শক্তিশালী ভাড়ার চুক্তিপত্র তৈরি করুন। সচেতনতাই আপনার সবচেয়ে বড় আইনি সুরক্ষা।
আইনবার্তা২৪ ডেস্ক 


















