ঢাকা ০৭:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ১২৫ টাকায় চাকরি: সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান ভূমিমন্ত্রীর Logo বাবার আহাজারি: ‘ঋণ শোধ হলো না, বুক খালি হয়ে গেল’ Logo টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: তদন্তে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ হাইকোর্টের Logo বেবি পাউডারে ক্যানসারের ঝুঁকি: ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে মামলা নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত জনসন অ্যান্ড জনসনের Logo বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুরের ৩ বছরের কারাদণ্ড Logo বেরোবি’র সাবেক ভিসি কলিমউল্লাহর জামিননামা মঞ্জুর, মুক্তিতে বাধা নেই Logo টুথপেস্টে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক: উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট Logo বিকাশ, নগদ ও রকেটের অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ কেন অবৈধ নয়: হাইকোর্টের রুল Logo সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই করেই সিদ্ধান্ত: আইনমন্ত্রী Logo সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের কোনো আইনি ভিত্তি দেখছে না সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন: কীভাবে কাজ করে ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’

দীর্ঘ ৩৭ বছর ইরান শাসন করা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এক নজিরবিহীন পরীক্ষার মুখে পড়ে। বিশ্বরাজনীতির স্পটলাইট এখন তেহরানের দিকে। “রয়টার্স, ইরান ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ছেলে মোজতবা খামেনির নাম সামনে আসায় এবং পরবর্তীতে তাঁর চূড়ান্ত মনোনয়নে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে— ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এই ‘সর্বোচ্চ নেতা’ আসলে কীভাবে নির্বাচিত হন? এটি কি কোনো বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো জটিল আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া?

সংবিধান অনুযায়ী দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতৃত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে, তার উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে ইরানের সংবিধানের একটি বিশেষ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান— ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ।

অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস: গঠন, ক্ষমতা ও আইনি ভিত্তি

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর মূলত সংবিধান রচনার জন্য গঠিত হলেও, পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে এই পরিষদকে নতুন করে একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পুনর্গঠন করা হয়। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন, অপসারণ এবং তাঁর কাজের তদারকি করার জন্য এটিই একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনি ও ধর্মীয় উচ্চকক্ষ।

এই পরিষদে মোট ৮৮ জন সদস্য থাকেন, যারা সবাই উচ্চপদস্থ শিয়া ইসলামি আইনবিদ বা মুজতাহিদ । প্রতি ৮ বছর পর পর ইরানের সাধারণ জনগণের সরাসরি ভোটে এই ৮৮ জন সদস্য নির্বাচিত হন। সবশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০২৪ সালে, যার বর্তমান মেয়াদ চলবে ২০৩২ সাল পর্যন্ত।

তাত্ত্বিকভাবে এটি জনগণের ভোটে হলেও, প্রার্থী হতে হলে আগে ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’ নামের আরেকটি শক্তিশালী সরকারি সংস্থার কঠোর যাচাই ও অনুমোদন পেতে হয়। এই কাউন্সিলের অর্ধেক সদস্যই আবার সর্বোচ্চ নেতা নিজে নিয়োগ দেন। ফলে সংস্কারপন্থী বা সমালোচক প্রার্থীরা প্রায়ই বাছাই পর্বেই বাদ পড়ে যান। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও বহু মধ্যপন্থী প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল এবং ভোটার উপস্থিতি ছিল ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন (প্রায় ৪০ শতাংশ)।

সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া (ধারা ১০৭ ও ১১১)

ইরানের সংবিধানের ১০৭ ও ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু হলে, পদত্যাগ করলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি সুনির্দিষ্ট কিছু আইনি ধাপে সম্পন্ন হয়:

১. অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ: নতুন নেতা নির্বাচন করতে যদি কিছুটা সময় লাগে, তবে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দেশের শাসনভার পরিচালনার জন্য একটি ৩ সদস্যের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠিত হয়। এই পরিষদে থাকেন ইরানের রাষ্ট্রপতি, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন প্রবীণ ফকিহ (আইনবিদ)। ২০২৬ সালে খামেনির মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মহসেনি-এজেয়ি এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফিকে নিয়ে এই পরিষদ গঠিত হয়েছিল।

২. প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই: সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতাকে অবশ্যই একজন শীর্ষস্থানীয় শিয়া মারজা (ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ), প্রখর রাজনৈতিক ও সামাজিক দূরদর্শিতা সম্পন্ন ব্যক্তি, সাহসী, দক্ষ সংগঠক এবং দেশের সাধারণ মানুষকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো আইনি ও প্রশাসনিক যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে।

৩. গোপন ব্যালটে ভোট: ৮৮ জন বিশেষজ্ঞের এই পরিষদ একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন। সেখানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক হয়। এরপর চূড়ান্তভাবে গোপন ব্যালটে ভোট গ্রহণ করা হয়।

৪. সংখ্যাগরিষ্ঠতা: তাত্ত্বিকভাবে সংবিধানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কথা বলা হলেও, চূড়ান্ত সিলেকশনে পরিষদের উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জয়ী ব্যক্তিই পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষিত হন। সংবিধানে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নেই, শুধু বলা আছে যে অ্যাসেম্বলিকে “সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে” এই কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

তাত্ত্বিকভাবে অ্যাসেম্বলি সর্বোচ্চ নেতাকে অপসারণও করতে পারে, যদি তিনি যোগ্যতা হারান। কিন্তু ১৯৭৯ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত এই পরিষদ কখনো সর্বোচ্চ নেতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, ফলে বিশ্লেষকদের একাংশ একে অনেকটাই আনুষ্ঠানিক (সিম্বলিক) একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখেন।

পর্দার আড়াল থেকে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় মোজতবা খামেনি

২০২৬ সালের ৩ থেকে ৮ মার্চের মধ্যে তীব্র নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) শুরুতে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে দ্রুত একজন নেতা ঘোষণার চেষ্টা করেছিল এবং পরবর্তীতে অ্যাসেম্বলি সদস্যদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৯ মার্চ ঘোষণা আসে— আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র, ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনিই হচ্ছেন ইরানের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা। ১৯৬৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া মোজতবা দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে খুব কম দেখা যাওয়া একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি মূলত পর্দার আড়ালে থেকে ক্ষমতা চর্চা করতেন। ১৯৮০-র দশকের শেষদিকে তিনি আইআরজিসিতে যোগ দেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন। ২০০৯ সালে বাসিজ আধা-সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর মোজতবা রাজনৈতিকভাবে আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। সংস্কারপন্থীরা তাঁকে ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পরবর্তী বিক্ষোভ দমনের জন্য দায়ী করেন।

কোমে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করলেও, ধর্মীয় পাণ্ডিত্যের বিচারে তিনি এখনো ‘হুজ্জাতুল-ইসলাম’ পদমর্যাদার— যা শীর্ষ ‘আয়াতুল্লাহ’ পদের নিচে। তাঁর বাবা আলী খামেনিও ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার সময় একই পর্যায়ে ছিলেন, তবে দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে আয়াতুল্লাহ ঘোষণা করা হয়েছিল।

কোনো নির্বাচিত বা আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত পদ ছাড়াই সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধিত্ব করে আসার অভিযোগে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ২০১৯ সালে তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

বংশানুক্রমিক নাকি সাংবিধানিক: কেন এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্ব গণমাধ্যমে আলী খামেনির পর তাঁর ছেলের শীর্ষ পদে আসার বিষয়টিকে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা ‘বংশানুক্রমিক’ বা রাজতান্ত্রিক রূপান্তরের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন, যা ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষত যেহেতু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব মূলত রাজতন্ত্র উৎখাতের জন্যই হয়েছিল। এমনকি ২০২৪ সালে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের এক বৈঠকে স্বয়ং আলী খামেনিও বলেছিলেন যে তাঁর ছেলেকে উত্তরসূরি বিবেচনা থেকে বাদ রাখা উচিত। তা সত্ত্বেও যুদ্ধকালীন অস্থির পরিস্থিতিতে আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ এই ব্যক্তিত্বই শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হন।

আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে মোজতবা খামেনির নির্বাচন ইরানের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি বাস্তব পরীক্ষা হয়ে থাকল। অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস কাগজে-কলমে একটি স্বতন্ত্র নির্বাচনী সংস্থা হলেও, এবারের ঘটনাক্রম দেখাল যে সামরিক বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রভাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কীভাবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। একইসঙ্গে, প্রথাগত সর্বোচ্চ ধর্মীয় পাণ্ডিত্যের শর্ত পুরোপুরি পূরণ না করেও একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে আসীন হওয়া— ইমাম খোমেইনির প্রবর্তিত “বেলায়াতে ফকিহ নীতির মূল আইনি কাঠামো ও ঐতিহ্যকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ইরানের শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত—তা সে যুদ্ধ-বিগ্রহের ঘোষণা হোক কিংবা অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়ন। আর তাই এই পদের নির্বাচন প্রক্রিয়ার আইনি ও সামরিক মারপ্যাঁক বোঝা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, উইকিপিডিয়া, এনপিআর ও সিএনবিসি।

Tag :

১২৫ টাকায় চাকরি: সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান ভূমিমন্ত্রীর

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন: কীভাবে কাজ করে ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’

আপডেট সময় ১২:৩৫:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘ ৩৭ বছর ইরান শাসন করা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এক নজিরবিহীন পরীক্ষার মুখে পড়ে। বিশ্বরাজনীতির স্পটলাইট এখন তেহরানের দিকে। “রয়টার্স, ইরান ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ছেলে মোজতবা খামেনির নাম সামনে আসায় এবং পরবর্তীতে তাঁর চূড়ান্ত মনোনয়নে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে— ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এই ‘সর্বোচ্চ নেতা’ আসলে কীভাবে নির্বাচিত হন? এটি কি কোনো বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো জটিল আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া?

সংবিধান অনুযায়ী দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতৃত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে, তার উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে ইরানের সংবিধানের একটি বিশেষ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান— ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ।

অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস: গঠন, ক্ষমতা ও আইনি ভিত্তি

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর মূলত সংবিধান রচনার জন্য গঠিত হলেও, পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে এই পরিষদকে নতুন করে একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পুনর্গঠন করা হয়। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন, অপসারণ এবং তাঁর কাজের তদারকি করার জন্য এটিই একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনি ও ধর্মীয় উচ্চকক্ষ।

এই পরিষদে মোট ৮৮ জন সদস্য থাকেন, যারা সবাই উচ্চপদস্থ শিয়া ইসলামি আইনবিদ বা মুজতাহিদ । প্রতি ৮ বছর পর পর ইরানের সাধারণ জনগণের সরাসরি ভোটে এই ৮৮ জন সদস্য নির্বাচিত হন। সবশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০২৪ সালে, যার বর্তমান মেয়াদ চলবে ২০৩২ সাল পর্যন্ত।

তাত্ত্বিকভাবে এটি জনগণের ভোটে হলেও, প্রার্থী হতে হলে আগে ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’ নামের আরেকটি শক্তিশালী সরকারি সংস্থার কঠোর যাচাই ও অনুমোদন পেতে হয়। এই কাউন্সিলের অর্ধেক সদস্যই আবার সর্বোচ্চ নেতা নিজে নিয়োগ দেন। ফলে সংস্কারপন্থী বা সমালোচক প্রার্থীরা প্রায়ই বাছাই পর্বেই বাদ পড়ে যান। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও বহু মধ্যপন্থী প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল এবং ভোটার উপস্থিতি ছিল ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন (প্রায় ৪০ শতাংশ)।

সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া (ধারা ১০৭ ও ১১১)

ইরানের সংবিধানের ১০৭ ও ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু হলে, পদত্যাগ করলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি সুনির্দিষ্ট কিছু আইনি ধাপে সম্পন্ন হয়:

১. অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ: নতুন নেতা নির্বাচন করতে যদি কিছুটা সময় লাগে, তবে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দেশের শাসনভার পরিচালনার জন্য একটি ৩ সদস্যের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠিত হয়। এই পরিষদে থাকেন ইরানের রাষ্ট্রপতি, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন প্রবীণ ফকিহ (আইনবিদ)। ২০২৬ সালে খামেনির মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মহসেনি-এজেয়ি এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফিকে নিয়ে এই পরিষদ গঠিত হয়েছিল।

২. প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই: সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতাকে অবশ্যই একজন শীর্ষস্থানীয় শিয়া মারজা (ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ), প্রখর রাজনৈতিক ও সামাজিক দূরদর্শিতা সম্পন্ন ব্যক্তি, সাহসী, দক্ষ সংগঠক এবং দেশের সাধারণ মানুষকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো আইনি ও প্রশাসনিক যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে।

৩. গোপন ব্যালটে ভোট: ৮৮ জন বিশেষজ্ঞের এই পরিষদ একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন। সেখানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক হয়। এরপর চূড়ান্তভাবে গোপন ব্যালটে ভোট গ্রহণ করা হয়।

৪. সংখ্যাগরিষ্ঠতা: তাত্ত্বিকভাবে সংবিধানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কথা বলা হলেও, চূড়ান্ত সিলেকশনে পরিষদের উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জয়ী ব্যক্তিই পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষিত হন। সংবিধানে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নেই, শুধু বলা আছে যে অ্যাসেম্বলিকে “সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে” এই কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

তাত্ত্বিকভাবে অ্যাসেম্বলি সর্বোচ্চ নেতাকে অপসারণও করতে পারে, যদি তিনি যোগ্যতা হারান। কিন্তু ১৯৭৯ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত এই পরিষদ কখনো সর্বোচ্চ নেতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, ফলে বিশ্লেষকদের একাংশ একে অনেকটাই আনুষ্ঠানিক (সিম্বলিক) একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখেন।

পর্দার আড়াল থেকে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় মোজতবা খামেনি

২০২৬ সালের ৩ থেকে ৮ মার্চের মধ্যে তীব্র নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) শুরুতে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে দ্রুত একজন নেতা ঘোষণার চেষ্টা করেছিল এবং পরবর্তীতে অ্যাসেম্বলি সদস্যদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৯ মার্চ ঘোষণা আসে— আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র, ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনিই হচ্ছেন ইরানের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা। ১৯৬৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া মোজতবা দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে খুব কম দেখা যাওয়া একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি মূলত পর্দার আড়ালে থেকে ক্ষমতা চর্চা করতেন। ১৯৮০-র দশকের শেষদিকে তিনি আইআরজিসিতে যোগ দেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন। ২০০৯ সালে বাসিজ আধা-সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর মোজতবা রাজনৈতিকভাবে আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। সংস্কারপন্থীরা তাঁকে ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পরবর্তী বিক্ষোভ দমনের জন্য দায়ী করেন।

কোমে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করলেও, ধর্মীয় পাণ্ডিত্যের বিচারে তিনি এখনো ‘হুজ্জাতুল-ইসলাম’ পদমর্যাদার— যা শীর্ষ ‘আয়াতুল্লাহ’ পদের নিচে। তাঁর বাবা আলী খামেনিও ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার সময় একই পর্যায়ে ছিলেন, তবে দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে আয়াতুল্লাহ ঘোষণা করা হয়েছিল।

কোনো নির্বাচিত বা আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত পদ ছাড়াই সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধিত্ব করে আসার অভিযোগে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ২০১৯ সালে তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

বংশানুক্রমিক নাকি সাংবিধানিক: কেন এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্ব গণমাধ্যমে আলী খামেনির পর তাঁর ছেলের শীর্ষ পদে আসার বিষয়টিকে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা ‘বংশানুক্রমিক’ বা রাজতান্ত্রিক রূপান্তরের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন, যা ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষত যেহেতু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব মূলত রাজতন্ত্র উৎখাতের জন্যই হয়েছিল। এমনকি ২০২৪ সালে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের এক বৈঠকে স্বয়ং আলী খামেনিও বলেছিলেন যে তাঁর ছেলেকে উত্তরসূরি বিবেচনা থেকে বাদ রাখা উচিত। তা সত্ত্বেও যুদ্ধকালীন অস্থির পরিস্থিতিতে আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ এই ব্যক্তিত্বই শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হন।

আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে মোজতবা খামেনির নির্বাচন ইরানের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি বাস্তব পরীক্ষা হয়ে থাকল। অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস কাগজে-কলমে একটি স্বতন্ত্র নির্বাচনী সংস্থা হলেও, এবারের ঘটনাক্রম দেখাল যে সামরিক বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রভাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কীভাবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। একইসঙ্গে, প্রথাগত সর্বোচ্চ ধর্মীয় পাণ্ডিত্যের শর্ত পুরোপুরি পূরণ না করেও একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে আসীন হওয়া— ইমাম খোমেইনির প্রবর্তিত “বেলায়াতে ফকিহ নীতির মূল আইনি কাঠামো ও ঐতিহ্যকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ইরানের শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত—তা সে যুদ্ধ-বিগ্রহের ঘোষণা হোক কিংবা অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়ন। আর তাই এই পদের নির্বাচন প্রক্রিয়ার আইনি ও সামরিক মারপ্যাঁক বোঝা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, উইকিপিডিয়া, এনপিআর ও সিএনবিসি।