সকাল ৯টা। আদালত চত্বর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।
কারও হাতে পুরোনো একটি ফাইল, কারও চোখে সারারাত না ঘুমানোর ক্লান্তি। বারান্দার এক কোণে উদ্বিগ্ন এক মা বারবার ফোনে সন্তানের খোঁজ নিচ্ছেন। অন্য পাশে এক বৃদ্ধ বেঞ্চে বসে কাঁপা হাতে কাগজগুলো আঁকড়ে ধরে আছেন। আদালতের করিডোরে ভেসে আসছে ফাইল ওল্টানোর শব্দ, পেশকারের ডাক, আইনজীবীদের ব্যস্ত পদচারণা আর বিচারকের এজলাস থেকে উচ্চারিত গম্ভীর কণ্ঠ।
এই ব্যস্ততার মাঝেই কালো কোট আর সাদা ব্যান্ড পরে নিজের চেম্বারের দিকে হাঁটছেন অ্যাডভোকেট গালিব রহমান।
বাইরে থেকে অনেকের চোখে আইনজীবীর জীবন মানেই যুক্তিতর্ক, সম্মান, ব্যস্ততা আর মোটা অঙ্কের ফি। কিন্তু এই কালো কোটের ভাঁজে লুকিয়ে থাকে অগণিত মানুষের কান্না, আশা, অপূর্ণতা আর শেষ ভরসার গল্প। প্রতিটি মামলার ফাইল আসলে একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক, একটি স্বপ্ন কিংবা ন্যায়বিচারের জন্য শেষ লড়াই।
আইনবার্তা২৪-এর পাঠকদের জন্য একজন আইনজীবীর ডায়েরির এমনই কিছু নীরব পাতা উন্মুক্ত করা হলো।
সকাল ৯টা ১৫ মিনিট — ফাইল নয়, মানুষের জীবন
ডেস্কে জমে আছে একের পর এক মামলার নথি।
কারও কাছে এগুলো কাগজের স্তূপ, কিন্তু রহমান সাহেবের কাছে প্রতিটি ফাইলের ওজন আলাদা।
একটি ফাইলে সন্তানের হেফাজত ফিরে পেতে সংগ্রামরত এক মায়ের দীর্ঘশ্বাস।
আরেকটিতে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত এক বৃদ্ধের শেষ আশ্রয়টুকু ফিরে পাওয়ার আকুতি।
একটি ফাইলে গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ, অন্যটিতে মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত এক তরুণের ভবিষ্যৎ।
ফাইলগুলো গুছাতে গুছাতে রহমান সাহেব প্রায়ই ভাবেন—মানুষ তখনই আদালতের দরজায় আসে, যখন জীবনের প্রায় সব দরজাই বন্ধ হয়ে যায়। তাই প্রতিটি মামলা শুধু আইনের বিষয় নয়, মানুষের বিশ্বাসেরও বিষয়।
দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট — আদালতে যুক্তির লড়াই, চোখে জমে থাকা অশ্রু
এজলাসে টানটান উত্তেজনা।
আজ তিনি দাঁড়িয়েছেন এক তরুণীর পক্ষে, যিনি বছরের পর বছর যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
বিপক্ষের আইনজীবীর ধারালো প্রশ্নে মেয়েটি বারবার থমকে যাচ্ছে। কাঁপছে তার কণ্ঠ। আদালতের নীরবতায় সেই কাঁপুনি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রহমান সাহেব দ্রুত নোট নিচ্ছেন। তিনি জানেন, আদালতে আবেগ নয়—প্রমাণ, যুক্তি আর আইনের ভাষাই কথা বলে। কিন্তু সেই আইনের মধ্যেই সত্যকে দৃশ্যমান করে তোলাই একজন আইনজীবীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত অভিযুক্তের জামিন নামঞ্জুর করেন। রায় ঘোষণার পর তরুণীটি কিছুই বলেননি। শুধু চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসা কয়েক ফোঁটা জল যেন অনেক অপ্রকাশিত কথা বলে দিল।
সেই মুহূর্তে রহমান সাহেব বুঝলেন—সব সাফল্য টাকা দিয়ে মাপা যায় না।
বিকেল ৪:০০ – আইনি জটিলতা বনাম মানবিক মূল্যবোধ
চেম্বারে এসে বসতেই প্রবেশ করলেন এক বৃদ্ধ।
জমিজমা নিয়ে জটিল বিরোধ। কথার ফাঁকে ফাঁকে বারবার বলছেন, “বাবা, আমি সত্যিই অন্যায় করিনি।”
আইনের দৃষ্টিতে মামলাটি দুর্বল। কিন্তু মানুষের গল্প শুনে বোঝা যায়, তিনি প্রতারণার শিকার।
বৃদ্ধ চলে যাওয়ার পর রহমান সাহেব ডায়েরিতে লিখলেন—“আইন চলে প্রমাণের ওপর। কিন্তু সত্য অনেক সময় প্রমাণের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়। একজন আইনজীবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো আইনের সীমার ভেতরে থেকেও ন্যায়বোধকে জীবিত রাখা।”
এই দ্বন্দ্বের উত্তর সব সময় পাওয়া যায় না। তবু প্রতিদিন নতুন করে চেষ্টা করতেই হয়।
রাত ৮টা — কালো কোট খুললেও দায়িত্ব শেষ হয় না
বাড়ি ফিরেছেন রহমান সাহেব।
কালো কোটটি আলমারিতে তুলে রাখা হয়েছে, কিন্তু দিনের ঘটনাগুলো এখনও মাথার ভেতর ঘুরছে।
কোনো মায়ের কান্না, কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ, কোনো নির্দোষ মানুষের অসহায় মুখ—সবই যেন সঙ্গে করে বাড়ি ফিরে আসে।
ডায়েরির শেষ পাতায় তিনি লিখলেন—‘অনেকেই মনে করেন, আইনজীবীরা শুধু মামলার ফি বোঝেন। কিন্তু দিনের শেষে আমরাও মানুষ। অন্যায়ের গল্প আমাদেরও ব্যথিত করে। কোনো মক্কেলের স্বস্তির হাসি আমাদেরও আনন্দ দেয়। আবার কোনো অসহায় মানুষের হার মেনে নেওয়া মুখ অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমাতে দেয় না।’
এই কালো কোট শুধু একটি পোশাক নয়; এটি এক বিশাল দায়িত্ব। প্রতিদিন ভেঙে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, আইনের ভাষায় তাদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার এবং ন্যায়বিচারের পথে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার এক নীরব অঙ্গীকার।
কেউ জিতে যান, কেউ হেরে যান। কেউ ন্যায়বিচার পান, কেউ অপেক্ষা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু প্রতিটি মামলার পেছনেই থাকে একজন মা, একজন বাবা, একটি সন্তান, একটি ভেঙে যাওয়া সংসার কিংবা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।
তাই একজন আইনজীবীর ডায়েরি শুধু আইনি নথির হিসাব নয়; এটি মানুষের চোখের জল, ভাঙা বিশ্বাস, অদম্য আশা আর ন্যায়বিচারের জন্য অবিরাম লড়াইয়ের এক জীবন্ত দলিল। কালো কোটের অন্তরালে তাই প্রতিদিন লেখা হয় অসংখ্য মানুষের গল্প।
অরুনিমা অনন্যা 


















