যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি করা ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) লটারি আবার আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘ বিলম্বের পর ২০২৭ অর্থবছরের ডিভি লটারির নিবন্ধন চালুর বিষয়ে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশিরা এবার আবেদন করতে পারবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচির নিবন্ধন দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় ছিল। গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালত নিবন্ধন চালুর নির্দেশ দেন। পরে সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরকে ২৯ অক্টোবরের মধ্যে নিবন্ধনের সময়সূচি ঘোষণা এবং ১ নভেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে এ নির্দেশের বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের আপিল ও তা কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ চাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। ফলে চূড়ান্ত সময়সূচি পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশিরা কি এবার আবেদন করতে পারবেন?
বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ডিভি লটারিতে অংশ নেওয়ার যোগ্য দেশের তালিকায় বাংলাদেশ থাকবে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি কর্মসূচিতে সাধারণত যেসব দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের হার তুলনামূলক কম, সেসব দেশের যোগ্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। প্রতিবছর যোগ্য ও অযোগ্য দেশের তালিকা প্রকাশ করা হয়। তালিকাটি বছরভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। সর্বশেষ প্রকাশিত ডিভি-২০২৬ কর্মসূচিতে বাংলাদেশ অযোগ্য দেশের তালিকায় ছিল। তবে এ তথ্যের ভিত্তিতে ডিভি-২০২৭ কর্মসূচিতেও বাংলাদেশ অযোগ্য থাকবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। পরবর্তী কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রকাশের পরই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: ডিভি লটারির যোগ্যতা সাধারণত আবেদনকারীর জন্মদেশের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, শুধু বর্তমান নাগরিকত্ব বা বসবাসের দেশ দিয়ে নয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বামী বা স্ত্রীর জন্মদেশের ভিত্তিতেও যোগ্যতা বিবেচিত হতে পারে।
কবে শুরু হতে পারে নিবন্ধন?
আদালতের সংশোধিত নির্দেশ অনুযায়ী, ডিভি-২০২৭ কর্মসূচির জন্য সম্ভাব্য সময়সূচি হলো—
২৯ অক্টোবর ২০২৬: নিবন্ধনের সময়সূচি ও অংশগ্রহণের নির্দেশনা প্রকাশের নির্ধারিত সময়সীমা।
১ নভেম্বর ২০২৬: নিবন্ধন চালুর নির্ধারিত সময়সীমা।
৩ ডিসেম্বর ২০২৬: নির্বাচিত আবেদনকারীদের অবহিত করার নির্ধারিত সময়সীমা।
এই সময়সূচি আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে। তবে সরকারের আপিল ও স্থগিতাদেশের আবেদনের কারণে এগুলো পরিবর্তিত হতে পারে। তাই তারিখগুলোকে চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
ডিভি লটারি আসলে কী?
ডাইভারসিটি ইমিগ্র্যান্ট ভিসা কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের একটি অভিবাসন কর্মসূচি। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত করে স্থায়ী বসবাসের ভিসা পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
কর্মসূচিটিতে বছরে সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার পর্যন্ত ভিসার সুযোগ থাকলেও প্রকৃত বরাদ্দ ও প্রাপ্যতা সংশ্লিষ্ট বছরের বিধান এবং অন্যান্য শর্তের ওপর নির্ভর করে। নির্বাচিত হলেই ভিসা নিশ্চিত হয় না। আবেদনকারীকে শিক্ষা বা কর্ম-অভিজ্ঞতার শর্ত, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং অন্যান্য অভিবাসন-সংক্রান্ত যোগ্যতা পূরণ করতে হয়।
আবেদন করতে কী কী প্রস্তুতি রাখবেন?
বাংলাদেশ ডিভি-২০২৭-এর যোগ্য দেশের তালিকায় থাকলে এবং নিবন্ধন চালু হলে সম্ভাব্য আবেদনকারীদের কয়েকটি বিষয়ে প্রস্তুত থাকা উচিত।
১. পাসপোর্ট: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণভাবে আবেদনকারীর বৈধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ নয় এমন পাসপোর্টের তথ্য এবং পাসপোর্টের নির্দিষ্ট পাতার স্ক্যান প্রয়োজন হতে পারে। প্রযোজ্য ব্যতিক্রম থাকলে তা সরকারি নির্দেশনায় উল্লেখ থাকবে।
২. শিক্ষাগত যোগ্যতা: সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সমমানের শিক্ষা সম্পন্ন করা অথবা নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী যোগ্য কর্ম-অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।
৩. ছবি: নির্ধারিত মাপ, পটভূমি ও অন্যান্য শর্ত অনুযায়ী সাম্প্রতিক ছবি প্রস্তুত রাখতে হবে।
৪. পরিবারের তথ্য: স্বামী বা স্ত্রী এবং যোগ্য সন্তানদের তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে। তথ্য গোপন বা ভুলভাবে উপস্থাপন করলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
নতুন নিয়ম ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বছরের সরকারি নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।
আবেদন কি বিনামূল্যে?
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রচলিত নির্দেশনায় অনলাইন ডিভি নিবন্ধন বিনামূল্যে করার কথা বলা হয়েছে। তবে ডিভি-২০২৭ কর্মসূচির জন্য নতুন নিবন্ধন ফি ও পাসপোর্ট-সংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তাই পরবর্তী কর্মসূচির চূড়ান্ত নির্দেশনায় নিবন্ধন ফি কত হবে, তা যাচাই করে আবেদন করা উচিত। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লটারি জেতার নিশ্চয়তা দিলে সতর্ক থাকুন। নিবন্ধন চালু হলে আবেদন করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্ধারিত সরকারি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। অন্য কোনো ওয়েবসাইটে আবেদন জমা দিলে তা বৈধ নিবন্ধন হিসেবে গণ্য হবে না।
সরকারি ওয়েবসাইট: https://dvprogram.state.gov
লটারি চালু হলেই কি ভিসা দেওয়া হবে?
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ৩১ আগস্ট ২০২৬-এ প্রকাশিত নির্দেশনায় জানিয়েছে, ডাইভারসিটি ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদন জমা দেওয়া ও সাক্ষাৎকারের কার্যক্রম চলতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় ডাইভারসিটি ভিসা ইস্যু করা হবে না। অর্থাৎ, নিবন্ধন চালু হওয়া, লটারিতে নির্বাচিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত ভিসা পাওয়া—এগুলো পৃথক ধাপ। একটি ধাপ সম্পন্ন হলেই পরবর্তী ধাপ নিশ্চিত হয় না।
বাংলাদেশিদের এখন কী করা উচিত?
বাংলাদেশের সম্ভাব্য আবেদনকারীদের আপাতত ডিভি-২০২৭-এর আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রকাশের অপেক্ষা করা উচিত। বিশেষ করে বাংলাদেশ যোগ্য দেশের তালিকায় আছে কি না, নিবন্ধন শুরুর তারিখ, পাসপোর্টের শর্ত এবং সম্ভাব্য ফি—এসব তথ্য সরকারি সূত্র থেকে যাচাই করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ডিভি লটারি আবার চালুর বিষয়ে আদালতের নির্দেশ এসেছে; কিন্তু বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের সুযোগ এখনো নিশ্চিত হয়নি। যোগ্য দেশের তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশিদের আবেদনযোগ্য ধরে নেওয়া বা আবেদন চালু হয়েছে বলে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 












